কেন প্রতিভার সংকটে আর্জেন্টিনা?



( মডারেটর )

জুলাই 5, 2018

আন্তর্জাতিক

1

1,260

বয়সভিত্তিক ফুটবলে একসময় আর্জেন্টিনার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সর্বোচ্চ ছয়বার যুব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াই যার প্রমাণ। কিন্তু ২০০৭ সালের পর আর যুব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি আর্জেন্টিনা। হঠাৎ করেই কীভাবে নষ্ট হয়ে গেল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন?

রাশিয়া বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে আর্জেন্টিনার বিদায়টা সমর্থকদের কাছে অপ্রত্যাশিত। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই প্রশ্নটা উঠবে, আর্জেন্টিনা দলের এর চেয়ে বেশি দূর যাওয়ার সামর্থ্য কি ছিল? আবেগকে এক পাশে সরিয়ে রেখে বাস্তবতা মেনে নিলে আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় সামর্থ্য এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো ছিল না। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তাদের ঘরোয়া ফুটবলে প্রতিভার সংকট।

 

অথচ বছর দশেক আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার সাফল্য ঈর্ষণীয় ছিল ২০০৭ পর্যন্ত। ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া যুব বিশ্বকাপের শিরোপা ২০০৭ সালের মধ্যে ৬ বারই জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ২০০৫ যুব বিশ্বকাপ জিতেই তো পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন লিওনেল মেসি। ২০০৭ যুব বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন বর্তমান দলের অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, সার্জিও আগুয়েরো, এভার বানেগারা।

এরপরই যেন প্রতিভার খরা নেমে এল আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলগুলোতে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মোট ২০ জন খেলোয়াড় মাঠে নামিয়েছে আর্জেন্টিনা। এর মধ্যে ৭ জনই ছিলেন ২০০৭ নয় তো ২০০৫ যুব বিশ্বকাপজয়ী দলে। ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৫ যুব বিশ্বকাপের দল থেকে ছিলেন মাত্র দুজন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, গত এক দশকে আর্জেন্টিনার তরুণ প্রতিভা আগের মতো বের হয়ে আসছে না।

লাতিন আমেরিকায় সব সময়ই তরুণ প্রতিভার ছড়াছড়ি। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাই যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০১৬ সালে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড় রপ্তানিতে শীর্ষ স্থান দখল করে আর্জেন্টিনা। কিন্তু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ক্লাবগুলোর দৌড়। নিজেদের অধীনে খেলোয়াড় তৈরি করতে পারছে না তারা।

আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লীগের দলগুলোর আয় নির্ভর করে খেলোয়াড় বিক্রির ওপর। আর্জেন্টিনা কম বয়সী প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আঁতুড়ঘর, যে কারণে প্রতিবছরই ক্লাবগুলো ইউরোপে খেলোয়াড় জোগান দিতে পারে। সেই খেলোয়াড় বিক্রির টাকা দিয়েই ক্লাবগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখে।

গত বছর আর্জেন্টিনা থেকে ১৭১৬ জন খেলোয়াড় ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন। যাঁদের বিক্রি করে আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলোর সম্মিলিতভাবে ১১৭ মিলিয়ন ডলার লাভ করেছে। গত পাঁচ বছরে আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে ইউরোপিয়ান মুদ্রা বিনিয়োগের হার বেড়েছে ৮০০%, যার সিংহভাগই এসেছে খেলোয়াড় বিক্রি থেকে।

এই খেলোয়াড় বিক্রি করে দেওয়াটাই কাল হয়েছে আর্জেন্টিনার জন্য। অপরিণত এসব তরুণ প্রতিভা ইউরোপের পরিবেশের সঙ্গে খুব সহজে মানিয়ে নিতে না পারায় ক্যারিয়ারের গতি ঘুরে যায়। যে সময় নিবিড় পরিচর্যা পাওয়ার কথা তখন তাঁদের ‍ভুগতে হয় ইউরোপের আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে। এভাবেই ঝরে পড়েন অনেকে, যাঁরা টিকে থাকেন তাঁদের মধ্যে হাতে গোনা কজনই যেতে পারেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে?

লিওনেল মেসি, সার্জিও আগুয়েরো, অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, গঞ্জালো হিগুয়েইনদের ব্যাচের পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা হলেন পাওলো দিবালা। এই দিবালাই শেষ আর্জেন্টাইন যিনি ইউরোপে এসেও খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছেন, নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পেরেছেন। দিবালার পর গত ৫ বছরে আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলের কেউই সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারেননি।

আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, তারা নিজেদের ফুটবলের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। সমসাময়িক দলগুলো যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফসল ঘরে তুলেছে চোখের সামনেই। ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো জয়ী স্পেন, ২০১১ কোপা আমেরিকা জয়ী উরুগুয়ে, ২০১৪ বিশ্বকাপ জেতা জার্মানি, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকা জেতা চিলি, প্রতিটি দলই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই সাফল্য ছুঁতে পেরেছে।

 

আর্জেন্টিনার সেদিকে খেয়াল নেই, গোঁজামিল দিয়ে দল তৈরি করে রাতারাতি ফল চায় তারা। আধুনিক যুগের ফুটবলে যা অসম্ভব। আর এই অসম্ভব ব্যাপারটিই যত দিন আর্জেন্টিনা ফুটবলের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের মাথায় ঢুকবে না, তত দিন বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন না দেখাই মঙ্গল সমর্থকদের জন্য।

সেলিম

লেখক

Related Posts