বাংলাদেশে চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্সি ( সি এ ) । ক্যারিয়ার হিসেবে সি এ কেমন ?



( মডারেটর )

ফেব্রুয়ারী 18, 2018

পড়ালেখা

9

2,304

বাংলাদেশে চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্সি – সি এ । ক্যারিয়ার হিসেবে সি এ কেমন?

যদিও চার্টার্ড এ্যাকাঊন্টেন্সি পাকিস্তান আমল থেকেই এদেশে চালু আছে তবে মুলত এর শুরুটা হয় ১৯৭২ সালে, রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধ্যাদেশ বলে। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত হয় দি ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ” (আইসিএবি)। বর্তমানে আইসিএবি একটি স্বাধীন এবংসায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান যা চাটার্ড একাউন্টেন্সি (সি.এ) প্রফেশন এর সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। আইসিএবি ইনস্টিটিউট টি ঢাকার কাওরানবাজারে সি.এ ভবনে অবস্থিত। সি.এ প্রফেশন হল একটি বিশ্বব্যাপী বৃহৎ এবং স্বাধীন পেশা। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও সারা বিশ্বে সি.এ প্রফেশন অত্যন্ত জনপ্রিয়। একজন কোয়ালিফাইড চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট বিশ্বের যে কোন দেশে অত্যন্ত সম্মানের সাথে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
চাটার্ড একাউন্টেন্সি যারা পড়তে পারবেঃ সি.এ হলো একটি ১০০% প্রফেশনাল কোর্স। বাংলাদেশে সি.এ পড়ার জন্য আইসিএবি এর একটি নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। যা মোটামুটি নিম্নরুপঃ এসএসসি এবং এইচএসসি অথবা সমমানের উভয় পরীক্ষা মিলে যদি কোন শিক্ষার্থী কমপক্ষে ৯ পয়েন্ট এবং কমপক্ষে একটিতে এ প্লাস পায় তাহলে সে সি.এ পড়তে পারবে। স্নাতক পাশের পরও (যে কেউ যে কোন বিষয় থেকে) সি.এ পড়তে পারবে। সে ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই স্নাতক পযন্ত সকল একাডেমিক পরীক্ষা মিলিয়ে কমপক্ষে ৭ পয়েন্ট থাকতে হবে।

১) ভর্তি হওয়ার যোগ্যতাঃ

২০০৭ সালের আগে গ্রাজুয়েশন করার আগে এই কোর্সে আসা যেতো না। কিন্তু ২০০৭ সালে কাউন্সিল এর সদস্যদের অনুমতিক্রমে এইচএসসি বা এ লেভেল পাশ করার পরও এই কোর্সে আসা যায়। বর্তমানে এই কোর্সে আসার জন্য নিয়ম হলঃ
ক. এইচএসসি এর স্টুডেন্ট-দের জন্যঃ
এসএসসি আর এইচএসসি মিলিয়ে ১০ এর মধ্যে ৯ পয়েন্ট থাকা লাগবে। সাধারনত বিজ্ঞান বিভাগ আর বানিজ্য বিভাগের স্টুডেন্টদেরই নেয়া হয়।
খ. এ-লেভেল এর স্টুডেন্টদের জন্যঃ
এ-লেভেল এ ২টা বি আর ১টা সি থাকতে হবে কমপক্ষে।
২) কোর্সের সময়ঃ
গ্রাজুয়েশন করে আসলে ৩ বছর এর কোর্স, রেজিস্ট্রেশন এর দিন থেকে ৩ বছর গননা করা হয়। আর যারা গ্রাজুয়েশন করে নাই তাদের জন্যঃ
ক। এইচএসসি পাশ করা স্টুডেন্টদের ক্ষেত্রে ৪ বছর
খ। এ-লেভেল এর স্টুডেন্টদের যদি ৩ টা বিষয়ে এ থাকে তাহলে তাদের জন্য ৩.৫ বছরের কোর্স। কিন্তু ৩টা না থাকলে তখন আবার ৪ বছর এর কোর্স করতে হবে।

৩) ভর্তি হওয়ার নিয়মঃ

ভর্তি হওয়ার জন্য সাধারনত কোনো অডিট ফার্মের সাথে জড়িত হতে হয়। এজন্য অবশ্য আপনাকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হতে পারে। যেমন, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের র্যা ঙ্কিং অনুযায়ী ১ নং অডিট ফার্ম একাউন্টিং, ইংরেজী, আইএফআরএস এর প্রশ্ন করে থাকে তাদের পরীক্ষায়। আবার বাংলাদেশ এর সবচেয়ে আলোচিত ফার্ম আরআরএইচ ও তাদের পরীক্ষায় এধরনের প্রশ্নই করে থাকে। এছাড়া অন্যান্য ফার্মে প্রশ্ন হিসাবে সাধারনত ইংরেজী নিয়েই বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। এই ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করলে আপনাকে আবার ভাইভা দিতে হয় যেখানে মূলত আপনার সিএ পড়ার কারনই জিজ্ঞাসা করে থাকে। ভাইভায় পাশ করলেই আপনাকে অডিট ফার্মে নিয়োগ দিবে।

৪) রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার নিয়মঃ

আপনি যখন একটি ফার্মে অংশ নিবেন তখন সাধারনত আপনাকে ট্রেইনি স্টুডেন্ট হিসাবে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এরপর স্থান খালি হলে আপনাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয় একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট এর সাথে কাজ করার জন্য। এই রেজিস্ট্রেষন এর গুরুত্ব হল আপনার যেদিন রেজিস্ট্রেশন হবে তার ১১ মাস এর মধ্যে আপনি কোনো পরীক্ষা দিতে পারবেন না। তাই যদি দেখা যায় যে ১০-১৫ দিনের জন্য আপনি পরীক্ষা দিতে পারছেন না, তখন উচিত হবে ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলে রেজিস্ট্রেশন এগিয়ে নেয়া।

৫) পরীক্ষা পদ্ধতিঃ

বছরে দুবার পরীক্ষা হয়ঃ জুন এবং ডিসেম্বর মাসে। এই দুই মাস এ পরীক্ষা হওয়ার কারণ হল এই সময় অডিট এর কোনো কাজই থাকে না। জুন মাসের পরীক্ষা দেয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই আগের বছরের জুলাই মাসের আগেই রেজিস্ট্রেশন করে ফেলতে হবে। আর যদি ডিসেম্বর এর পরীক্ষা দিতে হয় তাহলে আগের বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। একবার পরীক্ষা দেয়ার পর পরের পরীক্ষা দিতে কোনো সমস্যা হবে না।

৬) পরীক্ষার ধাপঃ

সিএ তে এখন মোট তিনটা লেভেল আছে, একটি লেভেল সম্পূর্ন পাশ করে পরবর্তী লেভেল এ যেতে হয়। তবে একবার পরীক্ষা দিয়ে যদি কোনো বিষয়ে পাশ করে থাকেন তাহলে পরের বার আর সেই পরীক্ষা দিতে হয় নাঃ

ক) নলেজ লেভেলঃ নলেজ লেভেল এ আছে মোট সাতটি বিষয়ঃ এসুরেন্স (অডিট), একাউন্টিং, বিজনেস ফাইনান্স, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন, ট্যাক্স, বিজনেস এন্ড কমার্সিয়াল ল আর আইটি। এই লেভেল এর পরীক্ষায় সাধারন আপনার প্রাথমিক জ্ঞান এর পরীক্ষাই হয়। ট্যাক্স বাদে সব কয়টা পরীক্ষা মাত্র ১.৫ ঘন্টা এবং পরীক্ষার মান পূর্ন ১০০ মার্ক। প্রশ্ন এমন ভাবে আসে যেন পুরো সময়টাই লিখে যেতে হয়। ট্যাক্স পরীক্ষার সময় হল ৩ ঘন্টা। এই পরীক্ষায় কিছুটা সময় পাওয়া যায়, তবে এটাই চ্যালেঞ্জিং বিষয় কারন প্রতি বছরের ফিনান্স এক্টের সাথেই পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আসে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ের এসআরও গুলোও মনে রাখতে হয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আইটি সাব্জেক্টটা আসলেই খুব বাজে কারন এর সাথে আপনার আসল আইটির কোনোই সম্পর্ক নেই। আরেকটি দুঃখের কথা হচ্ছে, বিজনেস ফাইনাস হল অডিট, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন, আইটি একাউন্টিং এর সংমিশ্রন। তবে আপনি যদি মাথা ঠান্ডা রেখে পরীক্ষা দিতে পারেন তাহলে খুব একটা কঠিন হবে না।

খ) এ্যাপ্লিকেশন লেভেলঃ এ্যাপ্লিকেশন লেভেল এও আছে সাতটি বিষয়ঃ অডিট এন্ড এসুরেন্স, ফিনান্সিয়াল একাউন্টিং, বিজনেস স্টাডিজ, ম্যানেজমেন্ট একাউন্টিং, ট্যাক্স-২, করপোরেট ল আর আইটি এ্যাপ্লিকেশন। এই লেভেল এর পরীক্ষায় একটু জটিল প্রশ্ন আসে এবং মূলত তা আপনার একটি বিষয়ে আপনি আপনার জ্ঞান কিভাবে ব্যবহার করবেন তা দেখা হয়। এই লেভেল এর পরীক্ষায় ২.৫০ ঘন্টা সময় থাকে এবং ১০০ মার্ক উত্তর দিতে হয়। তবে মাঝে মাঝেই দেখা যায় ৪-৫ টা প্রশ্নই ১০০ মার্ক এর। অর্থাৎ প্রচুর লিখতে হয়।

গ) এডভান্স লেভেলঃ এডভান্স লেভেল এ মোট চারটি বিষয় থাকে যার মধ্যে একটি হল কেস স্টাডিজ। কেস স্টাডিজ এর পরীক্ষা ৪ ঘন্টা হয়ে থাকে এবং প্রশ্ন হয় প্রায় ১০-২০ পাতার মত।

 

৭) কোচিং ক্লাসঃ

আপনি যখন প্রথমবার কোনো লেভেল এর পরীক্ষা দিবেন তার আগে আপনাকে অবশ্যই কোচিং ক্লাস করতে হয়। এই কোচিং ক্লাস প্রায় ৩ মাস ধরে চলে। বিরক্তের বিষয় হচ্ছে, এই কোচিং ক্লাস হয় অফিসের পর অর্থাৎ ৬-৯ টা এবং শুক্র শনিবারও ক্লাস হয়ে থাকে।

৮) অডিট কর্মঃ

আপনি যখন ফার্মের সাথে যোগ দিলেন তখন আপনাকে বিভিন্ন কোম্পানির কাজ নিরীক্ষা করতে পাঠানো হবে। এই নিরীক্ষা কর্মে আপনাকে সাহায্য করার জন্য অনেক সিনিয়র স্টুডেন্ট তো থাকবেই সাথে পাশ করে যাওয়া চার্টার্ড একাউন্টেন্টরাও থাকবে। তাই এই কাজ আসলে তেমন কঠিন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আপনাকে বলে দেয়া হবে কি করতে হবে।

৯) কোর্সের ফিঃ

আপনাকে রেজিস্ট্রেশন করার সময় ৩০,০০০ টাকা দিতে হবে। এই ফি এর মধ্যে আপনার প্রথম লেভেল এর বই আছে এবং কোচিং ক্লাস এর ফিও আছে। এরপর যখন পরীক্ষা দিবেন তখন পরীক্ষার ফি হিসাবে প্রতি বিষয়ের জন্য ১,৩০০ টাকা দেয়া লাগে। কিন্তু আপনি যদি ৭টা বিষয়ই দেন তাহলে ৮,৫০০ টাকা হয় মোট ফি। এরপর যখন নলেজ লেভেল পাশ করে এ্যাপ্লিকেশন লেভেল এ যাবেন তখন ১৫,০০০ টাকা দিয়ে কোচিং ক্লাস এর জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে হবে, আর বই কিনতে হবে ৪,৫০০ টাকা দিয়ে। আবার পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রতি বিষয়ে ৩,০০০ টাকা ফি দিতে হবে। আবারও আপনি যদি এক সাথে সব বিষয়ের পরীক্ষা দেন তাহলে ১৮,০০০ টাকা দিলেই হবে। এডভান্স লেভেল এর জন্যও ক্লাশ ফি ১৮,০০০ টাকা আর প্রতি বিষয়ের জন্য পরীক্ষা ফি ৫,০০০ টাকা। তবে সর্বমোট ১০,০০০ টাকা।

১০) পারিতোষিকঃ

সাধারনত আপনি যে ফার্মে কাজ করে থাকেন তারা আপনাকে হাত খরচ হিসাবে সামান্য পারিতোষিক দেয়া হয়ে থাকে। আইসিএবির নিয়ম অনুযায়ীঃ
ক) রেজিস্ট্রেশনের পর থেকে ১ বছর পর্যন্ত ৩,০০০ টাকা/প্রতি মাস
খ) রেজিস্ট্রেশনের ১ বছর পর থেকে ২ বছর পর্যন্ত ৩,৫০০ টাকা/প্রতি মাস
গ) রেজিস্ট্রেশনের ২ বছর পর থেকে ৩ বছর পর্যন্ত ৪,০০০ টাকা/প্রতি মাস
ঘ) রেজিস্ট্রেশনের ৩ বছর পর থেকে ৪,৫০০ টাকা/প্রতি মাস
১১) সামান্য হিসাবঃ
আপনি আপনার পুরো কোর্সের মধ্যে পাবেনঃ ৩,০০০১২+৩,৫০০১২+৪,০০০*১২= ১২৬,০০০ টাকা
আর আপনি যদি প্রতি দুবার পরীক্ষা দিয়ে দুটি লেভেল পাশ করেন তাহলে খরচ হবেঃ
৩০,০০০+৮,৫০০+৮,৫০০+১৫,০০০+১৮,০০০+১৮,০০০= ৯৮,০০০ টাকা
অর্থাৎ আপনার ২৮,০০০ টাকা সঞ্চয় হবে। আর ২টা লেভেল পাশ করার পরই এখন বেশ ভালো চাকুরি পাওয়া যায়।
১২) বোনাসঃ
আপনি অডিট করার জন্য অনেক জায়গায় ঘুরতে যেতে পারবেন, যেমন সিলেট, চিটাগাং, কক্সবাজার, রাঙামাটি এবং অন্যান্য এবং তাও আবার অফিসের খরচে।

আলামিন

লেখক

Related Posts