ছায়া মানবী – পর্ব দুই



বিকেলে ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরতেই দেখি সানু ছাদে দাড়িয়ে আছে। ভাবলাম হয়তো শুকানো কাপড় নিতে এসেছে । ও সাধারনত কোন কাজ না থাকলে ছাদে আসে না । কিন্তু আমাকে অবাক করে দিল ও আজ , বলল ও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল । আমি ওর কথা শুনে হা হয়ে তাকিয়ে রইলাম, বললাম “ঘটনা কি সানু? আজ হঠাৎ এত ভালবাসা কোত্থেকে, যে আমার জন্য অপেক্ষা করছো!” , ও হো হো করে একটু হেসে নিল, তারপর গলা ঝেড়ে আমাকে বলল ”হুম এখনইতো আপনার আসার সময়, তাই দাড়িয়ে আছি। একটু বিশেষ দরকার ছিল । ” আমি বললাম ‘তুমি দাড়াও, আমি হাতমুখ ধুয়ে আসছি’ ও দাড়িয়ে থাকলো, আমি ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ওকে আর পেলাম না । ভাবলাম হয়তো চাচি ডেকেছে তাই চলে গেছে । সন্ধ্যার পর ওদের দুইভাই বোনের আসার কথা, কিন্তু সানু একা এসেছে । ওর কাছে রিয়াজের কথা জিজ্ঞেস করলাম , বললো ওর শরীর খারাপ লাগছে, তাই পড়তে আসেনি । আমি বললাম “ঠিক আছে, তুমি বই খুলে পড়তে শুরু করো” ।
আমিও পত্রিকার ম্যাগাজীনে একটা গল্প পড়তে আরম্ভ করলাম । গল্পটা একটু থ্রিলার টাইপের, যেকোন থ্রিলার  মুভি কিংবা গল্প প্রথম দিকে যে কোন দর্শক কিংবা পঠকদের একটু বোর করে দেয় । আস্তে আস্তে আরও যত ভেতরের দিকে যাওয়া যায় আর সাসপেন্সটা একটু একটু বোঝা যায় তখনই আসল মজা পাওয়া যায়, এজন্য রহস্য প্রেমীদের এ ধরনের বই বেশি পড়তে দেখা যায় । আমিও একটু রহস্য প্রেমী, তাই ম্যাগাজিনের ঐ গল্পটাতেই মগ্ন হয়ে গেলাম । সানু হঠাৎ চিৎকার দিয়ে এসে আমাকে ঝাপটে ধরলো । আমি ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারলাম না, দেখলাম ওর পুরো শরীর কাপছে, কোনভাবে ওকে শান্ত করলাম, তারপর জিজ্ঞেস করলাম কেন সে এত ভয় পেয়েছে ! ও বলল “আমি জানালাই ওপাশে দেখলাম হুবহু আমার মতন একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে, আর আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে । ওর কথা শুনে বুঝলাম নিশ্চয় ওর হ্যালুসিনেশন হয়েছে, কিন্তু  ওর অবস্থা  দেখে মনে হচ্ছে প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। 

সকালবেলা  সানু আবার এসেছে আমার সাথে দেখা করতে। আমি ওকে দেখে একটু মুচকী হেসে বললাম ”কি ব্যাপার! ভয় কাটলো? রাতে ভয় পেয়ে যে চিল্লানিটা দিলেন ?? ” ,, ও আমার কথা শুনে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে । তারপর বললো ও সত্যিই একদম ওর মতন দেখতে একটা মেয়েকে দেখেছে জানালায়। শুধু ওর মতন দেখতেই না, বরং ঐ মুহুর্তে ওর শরীরে যে জামাটা পরা ছিল ঐটাও ছিল তার গায়ে । ঘরের আলো জানালা দিয়ে বের হয়ে সোজা তার শরীরে পড়ছিল, তাই মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখেছে  সানু । আমি মজা করে ওকে বললাম ”তুমি সবসময় আয়নার সামনে দাড়িয়ে সাজুগুজু তে ব্যাস্ত থাক, এটা তারই প্রতিফলান । এজন্যই মনে হয় আয়নার মত সব জায়গাই নিজেকে দেখতে পাচ্ছ তুমি , এই বলে আমি হাসতে থাকলাম আর ও আমার দিকে রাগান্বীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ।    

আজকেও বিকেলে ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে দেখলাম সানু দাড়িয়ে আছে । হাতে একটা কাগজের নৌকা , আমাকে দেখে ওর ঠোটের কোনে একটু মুচকী হাসির আভাস দেখতে পেলাম । ফ্রেশ হয়ে এসে ওর সাথে গল্প করতে থাকলাম । আজই প্রথম সানুকে এত বেশি কথা বলতে দেখলাম , প্রচন্ড আবেগ নিয়ে কথা বলতে পারে ও । ওর কথা গুলো অনেকটা ঝির ঝির বৃষ্টির মতন লাগলো  আমার কাছে, এতদিন যে সানুকে চিনতাম এ যেন সে নয়। আজ ওর চোখে রাগের কোন ছাপ নেই। অন্যরকম ভাললাগা অনুভব করলাম ওর প্রতি, ওর কথা বলার ভঙ্গিমা আমাকে একটু একটু কাছে টানতে থাকলো ।

মাগরীবের আজান পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে ও বাসায় যেতে চাইলো, বলল কিছুক্ষন পর বই নিয়ে পড়তে আসবে। সন্ধ্যার পর আমি আবার এসে ছাদের পশ্চিম দিকটাতে বসে রইলাম । আটটা বেজে গেল কিন্তু সানু আর এলো না, ভাবলাম আজ হয়তো আর আসবেনা। শরীরে ক্লান্তির কারনে একটু আগেই ঘুমিয়ে পড়লাম । হঠাৎ দরজায় কে যেন নক করলো, সেই শব্দেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বারোটা বাজে , জানালা দিয়ে বাইরে আকাশ দেখা যাচ্ছিল । পরিষ্কার আকাশ, টুকরো টুকরো মেঘের খন্ড ভেসে বেড়াচ্ছে, আর চাঁদ সেই মেঘের আড়ালে মাঝে মাঝে লুকিয়ে পড়ছে । আমি আস্তে আস্তে উঠে ঘরের লাইট জ্বালালাম। দরজায় গিয়ে ”কে” জিজ্ঞেস করলাম । ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বলল “আমি সানু, তাড়াতাড়ি দরজা খোলেন” । আমি দরজা খুলতেই ও হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো ।  আমি অবাক হলাম ওর এই কান্ড দেখে, ওকে বললাম, এত রাতে কেন এসেছো , কেউ টের পেলে কেলেঙ্কারী ঘটবে। তোমাকে আমাকে, দুজনকেই খরাপ ভাববে । ও কিছু বললো না, শুধু একভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর চোখে আমি কামনা দেখতে পাচ্ছি, পুরুষ মানুষ হিসেবে এমন সময়ে নিজেকে আয়ত্ত করা  কষ্টসাধ্য বটে,, কাছে গিয়ে ওর হাতটা ধরলাম , এমন সময় ওকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল আমার, অন্যদিকে  ভেতর থেকে বাধা অনুভব করলাম । ওর হাত ছেড়ে দিয়ে ঘরে যেতে বললাম, ও তখন বললো আমার সাথে গল্প করবে । আমি বললাম “কাল বিকেলে গল্প করা যাবে। এখন অনেক রাত, ঘরে যাও ” ও কিছুতেই কথা শুনছিল না । এদিকে এত রাতে এই আবদ্ধ ঘরে ওর সাথে থাকলে নিজেকে আয়ত্তে রাখতে পারবোনা । মানুষের শরীরে কামনা জাগার জন্য পরিবেশে অনেকটা দায়ি থাকে । তাই বাহিরে খোলা আকাশের নিচে গিয়ে বসলাম দুজনে । সামনাসামনি বসেছি, ও কিছু বলছেনা । আমি বললাম “আজ এত পাগলামী কেন ?? হঠাৎ কি হয়েছে তোমার??” সানু চেয়ারটা সরিয়ে এনে আমার পাশে বসলো, তারপর আমার কাধে আলতো করে মাথা রাখলো,, বলল, বিয়ে করবেন আমাকে ? আমি আপনার প্রেমে পড়েছি । 

ওর কথা শুনে আমার চোখ কপালে উঠলো , কিছু বলতে পারছিলামনা । কি  বলছে মেয়েটা! পাগল হয়ে গেলো নাকি ? ও প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে মাথা সরিয়ে নিল । ও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, আর আমি ওর দিকে। নিস্তব্ধ এই রাতে দুজনেই নিস্তব্ধ হয়ে আছি , আমি ভাবছি ওর সেই কথাটা “আমি আপনার প্রেমে পড়েছি”, কিন্তু ও কি ভাবছে আমি জানি না । তবে ওর ভেতর বিষন্নতা দেখতে পাচ্ছি, আমিও নিজের মনের কথাটাকে আটকে রাখতে পারলামনা । বলে ফেললাম “সানু আমিও তোমাকে ভালবাসি” ও আমার কথা শুনে আমার দিকে তাকাল, কিন্তু এবার ওর চহনিতে আমি লজ্জার অাভাস পেলাম, ও কিছু না বলেই উঠে চলে গেল । আমি বসে রইলাম ছাদের কার্নিশে , সারারাত খোলা আকাশের নিচেই বসে রইলাম, এ যেন সুখের অনুভুতিময় একটা রাত উপহার পেলাম, যা আমাকে ক্রমশই অসার করে দিল। সানুর ঐ চাহনি মনের ভেতর ভাসছে, সাথে আকাশের ঐ টুকরো মেঘেদের হাতছানি, চাঁদটাও আজ খুব বেশি সুন্দর লাগছে  । একটা মানুষের কাছে পৃথিবীটা খুব বেশি সুন্দর আর স্বপ্নময় লাগে তখনই যখন সে বুঝতে পারে তার ভেতর প্রেম নামক কোন এক অনুভুতি বাসা বেধেছে । আমিও তেমনটায় অনুধাবন করছি আজ,  কিন্তু সেই সুন্দর স্বপ্ন গুলোও যে কোন এক সময় দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে তা কখনই আশাতীত নয় ।

মোস্তাফিজ আর রহমান

আসসালামু আলাইকুম,, আমি মোস্তাফিজ, ডাক নাম উল্লাস । আপনি আমার এবাউট পড়ছেন এর মানে আপনি এই মুহুর্তে আমার প্রোফাইলে আছেন এবং তার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । আসলে আমি যখন থেকে ইন্টারনেট জগতের সাথে পরিচিত হয়েছি ঠিক তখন থেকেই অনলাইনে বিভিন্ন লেখকদের লেখা পড়তাম আর তাদের কাছ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করার চেষ্টা করতাম । আমি ২০১২ তে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম , তারপর ওয়েবসাইট এবং সফ্টওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর উপর কোর্স করে পড়াশুনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং এ কাজ করতে থাকি । ব্লগিংএ খুব বেশি আকর্ষন থাকার কারনে ২০১৭ এর ৮ই অক্টোবর ”জনতা ব্লগ” এর প্রতিষ্ঠা করি। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি ব্লগ এ মানসম্মত কিছু লোখার জন্য, তাই পাঠকদেরে কাজে লাগবে সেই সমস্ত টপিক গুলোর উপরেই লেখার চেষ্টা করি । ”জনতা ব্লগ” এর অন্যান্য লেখকদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই তাদের মুল্যবান প্রকাশনা গুলোর জন্য । একটা ব্লগের সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ হলো সেই ব্লগ এর নিয়মিত যারা লেখক এবং পাঠক আছেন, তাহাদের অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য। তাই আপনাদের আবারও ধন্যবাদ জানাই ”জনতা ব্লগ” এর হাতে হাত রেখে পাশাপাশি চলার জন্য । আপনারা পাশে আছেন বলেই আমরা এ পর্যন্ত এগিয়ে আসতে পেরেছি ।

Related Posts