ছায়া মানবী – পর্ব এক



ভোরে জানালা দিয়ে আকাশ দেখছি, শরতের আকাশ.. চারদিকে টুকরো টুকরো মেঘ মাঝে মাঝে এক পশলা বৃষ্টি ঝরিয়ে তাদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে । প্রকৃতি তার অপার মহিমায় নিজেকে সাজিয়েছে । এ যেন কোন রুপসীর কোমল ঠোটের কোনে এক টুকরো বাঁকা হাসি, যে হাসি একবার দেখলে সহস্র বছর ধরে মনের গহীনে মায়াজাল বুনে যায়। কাজল কালো মায়াবী চোখ, ঐ চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় এ যেন কান্নার আগামবার্তা, আর আমি অতি নিমিষেই তার প্রেমে পড়েছি । জানালার পাশেই আমার শোয়ার জায়গা টা, চট্রগ্রামের কোন এক মফস্বল এলাকায় ছোট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি । বাড়িটিতে ব্যাচেলরদের জন্য বাসা ভাড়া দেওয়া হয়না। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই তিন তলা বাড়িটি আমার এক দুঃসম্পর্কের চাচা বানিয়েছিল,  সেই সুবাদেই আমাকে চিলেকোঠার পাশের দুই রুমের বাসাটি দেওয়া হয়েছে । আমার সদর দরজা খুললেই সামনে সুবিশাল ছাদ । আমার বাসার উপরে টিন থাকায় বৃষ্টির সময়টা খুব উপভোগ করি । সকাল ছয়টায় ঘুম ভেঙ্গে যায়, শরতের আকাশ আর প্রকৃতির মেঘাচ্ছন রুপ দেখতে দেখতে এখন আটটা বাজে । হঠাৎ বৃষ্টি নামায় টিনের চালের ঝপ ঝপ শব্দে আমার ঘোর কাটলো। তখনি দরজায় কে যেন নক করলো, খুলে দেখি সানু আধো ভেঝা হয়ে দাড়িয়ে আছে, হাতে একটা ট্রে , বুঝতে পারলাম.. চাচি সানুর কাছে আমার জন্য নাস্তা পাঠিয়ৈছে ,আর সে আগে ছাদে গিয়ে ভিজে নিয়েছে । মেয়েদের এই একটায়  স্বভাব সবচেয়ে সহজাতিক । এরা বৃষ্টি দেখলেই কোথাও যেন হারিয়ে  যায়,  সানুর অবস্থা দেখে আমার হাসি পেল… দরজা খুলতেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকলো, তারপর আলনায় ঝুলে থাকা টাওয়েলটা দিয়ে মাথা, হাত আর মুখ মুছলো । মেয়েটা খুবই চঞ্চল, আলম চাচার ছোট মেয়ে । আমার সাথে তার খুব একটা জমে না । উঠতে বসতেই সে আমাকে কোন না কোন কটু কথা বলে ফেলে, এখনও বাকি রইলোনা, আমার টাওয়েল দিয়ে মুখ মোছার সময় বললো “আপনি কি জীবনেও টাওয়েলটা ধুয়ে দেননায় ? এত গন্ধ হয়েছে !” এই বলে বাথরুমে ঢুকে  টাওয়েলটা বালতিতে ভিজিয়ে রাখলো, তারপর আমাকে গোসল করার সময় টাওয়েলটা ধুয়ে নেওয়ার আদেশ দিলো । তার এই সকল কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়, সকালের এই বৃষ্টিবিলাসী দিনটার গোড়াটায় তেঁতো করে দেবে এমনটা আশা ছিলনা, কিন্তু কিছু করার নাই, তার মা আমাকে যথেষ্ট আদর করে, বাবা ছাড়া কথা বলেন না, ভাল কিছু রাধলেই আমার জন্য পাঠিয়ে দেবে, আমার বয়সী তার একটা ছেলে ছিল, এখন আর নেই । তাই হয়তো আমার প্রতি তার একটু মায়া কাজ করে । এজন্যেই  তার মেয়েকে ধমক দিতে পারিনা, যতই তেঁতো কথা বলুক না কেন চুপচাপ থাকি,  মাঝে মাঝে হেসে দিই বলে সানু আরও বেশি রেগে যায়, তার ফর্সা চেহারায় রাগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।

পাশের পাহাড়ি পরিবেশ ছাদের পশ্চিম দিকটা একটু বেশি উপভোগ্য করে তুলেছে, প্রায়ই ওপাশে গিয়ে দাড়িয়ে থাকি। পড়ন্ত বিকেলে সময়টায় সূর্য্যটা পাহাড়ের ওপাশ থেকে সোনালী আলো ছড়িয়ে দেয়, তারপর আস্তে আস্তে পাহাড়ের কোল ঘেষে নামতে নামতে এক সময় বিলীন হয়ে যায়। তারপর নেমে আসে রাতের অবছায়া । সে সময় অব্দি দাড়িয়ে থাকি, পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি, দক্ষিনের বাতাসে পাহাড়ের গাছ গুলো হেলে দুলে  পাহাড়টাকে আরও বেশি মনোরম করে তোলে। শরতের আকাশের কোন বিশ্বাস নেই, কিছুক্ষন আগেও আকাশ পরিষ্কার ছিল, হঠাৎ বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে নিমিষেই থেমে গেল । আমি তখনও দাড়িয়ে আছি । সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্ত, সূর্য্যটা বিলীন হওয়ার পথে, এমন সময়ই এক টুকরো মেঘ সুর্য্যটাকে আড়াল করে দিলো । ঐ দিকটাতেই তাকিয়ে ছিলাম,,  মনে হলো পাহাড়ের ওপর দিয়ে যেখানে সূর্য্যটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেছে ঠিক সে জায়গাটাতেই একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে, বাতাসে তার চুল এলোমেলো ভাবে উড়ছিল, এপাশ থেকে তার মুখচ্ছবি স্পষ্ট না । আমি এক পলকেই চেয়ে রইলাম, এক অজানা টান কাজ করলো আমার ভেতরে। আমি দাড়িয়ে রইলাম যতক্ষন না সেই মায়াবিনীর অবয়ব অন্ধকারে মিশে গেল। হঠাৎ আবারও ঝপঝপ করে বৃষ্টি নামলো, আমি দৌড়ে ঘরে চলে আসলাম । মস্তিষ্কে সেই পাহাড়ি কন্যার প্রতিচ্ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে । আমি নিজেকে এলোমেলো করে ফেলছি, এতটায় এলোমেলো হয়ে পড়েছি যে আমার কাছে চারদিকটা খুবই অপরিচিত লাগছে, আমি কোনভাবেই বাস্তবতার কাছে ফিরে আসতে পারছিনা, মন ও কেমন উদাসী হয়ে উঠেছে । এমন সময় সানু আর তার ছোট ভাই রিয়াজ এলো পড়ার জন্য, ওরা মাঝে মাঝে আমার কাছে পড়তে আসে। সানু ইন্টারের ছাত্রী, কিছুদিন আগে প্রথম বর্ষের ফাইনাল দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে, রিয়াজ সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে। আর আমি অনার্স পড়ছি, সবে মাত্র তৃতীয় বর্ষ। পড়াশুনার জন্যই মূলত পারিবারিক ভাবে একটু দুরে থাকা হয় ।

দরজা খোলা থাকায় সানু আর রিয়াজ এর দরজায় নক করে আর অপেক্ষা করতে হলো না, সোজা রুমে ঢুকে পড়লো। ঝড়ো হাওয়ার কারনে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল,, এখনও ঘর অন্ধকার হয়ে আছে , আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি, হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছি। ঘর অন্ধকার দেখে সানু রীতিমতোন বকবক করা শুরু করে দিয়েছে,  আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতি বের করে জ্বালালো, তারপর রিয়াজকে পড়তে বসতে বলে চলে গেল । আমি তখন উঠে পড়লাম, ফ্রেশ হয়ে আমিও একটা বই নিয়ে বসলাম । কিছুক্ষন পর সানু একটা ফ্লাস্ক এ করে  চা নিয়ে এলো । মেয়েটা আমার সাথে ভালভাবে কথা না বললেও আমার দিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখে, মাঝে মাঝে এভাবে চা বানিয়ে দিয়ে যায়, ও জানে সন্ধ্যার সময়ে আমি চা ছাড়া বাঁচিনা। এসে আমাকে এক কাপ দিল আর নিজে এক কাপ নিল, রিয়াজ বললো ”আপু আমিও খাবো”, তখনি বেচারাকে চায়ের বদলে একটা ধমক খেতে হলো, সানু চোখ পাকিয়ে বলে উঠলো ”এত ছোট বয়সে চা খেতে হবেনা, মন দিয়ে পড় বলছি”,, এরপর আমার দিকে একটু তাকালো। ওর চোখদুটো খুবই মায়াবী,, কিন্তু আমার দিকে যখন তাকায় তখন মনে  হয় আমি তাকে ইভ-টিজিং করছি, আর সে সুযোগ পেলেই আমাকে কিল ঘুষি মেরে বসবে, অদ্ভুত মেয়েটা। আমি কোনভাবেই ওকে বুঝতে পারিনা, সময়ে ভাল আবার সময়ে খারাপ, অনেকটা শরতের মতন, সময়ে পরিষ্কার নীল আকাশ আবার সময়ে টুকরো টুকরো মেঘের ঘনঘটা । আজকে ও রসায়ন নিয়ে এসেছে পড়ার জন্য, কিন্তু পড়ার চাইতে বেশি অন্য প্রসঙ্গে কথা বলছে, তার বান্ধবীর কথা, রাবেয়া ম্যাডামের কথা, আনিসুল স্যারের ভুড়ির কথা আরও কত কি! ওর কথা শুনতে ‍শুনতে আমার আবারও সেই পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে থাকা অচেনা পাহাড়ি কন্যার কথা মনে পড়লো । সানুকে জিজ্ঞেস করলাম পাহাড়ের ওপর কোন বাড়ি আছে কিনা । ও ”না“ বললো, তারপর আবার আমাকে উল্টো প্রশ্ন করলো “আমি হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞেস করলাম কেন ?” ,, আমি ওকে আর বললাম না। কিন্তু আমার মস্তিষ্কে এক অজানা রহস্য বাসা বাধতে থাকলো, হয়তো আমি চোখে ভুল দেখেছি,, কিন্তু এমন হওয়ার কথা না । আমি যখন মেয়েটাকে দেখেছি তখন আমি একদমই ফ্রেশ ছিলাম, সুস্থ ছিলাম এবং ঠান্ডা মেজাজেই ছিলাম, সুতরা কোনভাবেই হ্যালুসিনেশন হওয়ার কথা না । আর যদি সত্যিই সে কোন মেয়ে হয়ে থাকে তাহলে একা একটা মেয়ে ঐ সময়টাতে ওখানে কি করছে । সে কি কোন সাধারন মানুষ ছিল না ?? এরকম নানা প্রশ্ন আমার মাথায় আসছে । বাইয়ে মন বসছেনা, সানু ওর মত করে কথা বলেই যাচ্ছে, আর ওর স্রোতা হয়ে বসে আছে রিয়াজ, আমি আমার কাছে নেই, আমি ঐ পাহাড়েই হারিয়ে গেছি ।

মোস্তাফিজ আর রহমান

আসসালামু আলাইকুম,, আমি মোস্তাফিজ, ডাক নাম উল্লাস । আপনি আমার এবাউট পড়ছেন এর মানে আপনি এই মুহুর্তে আমার প্রোফাইলে আছেন এবং তার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । আসলে আমি যখন থেকে ইন্টারনেট জগতের সাথে পরিচিত হয়েছি ঠিক তখন থেকেই অনলাইনে বিভিন্ন লেখকদের লেখা পড়তাম আর তাদের কাছ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করার চেষ্টা করতাম । আমি ২০১২ তে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম , তারপর ওয়েবসাইট এবং সফ্টওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর উপর কোর্স করে পড়াশুনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং এ কাজ করতে থাকি । ব্লগিংএ খুব বেশি আকর্ষন থাকার কারনে ২০১৭ এর ৮ই অক্টোবর ”জনতা ব্লগ” এর প্রতিষ্ঠা করি। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি ব্লগ এ মানসম্মত কিছু লোখার জন্য, তাই পাঠকদেরে কাজে লাগবে সেই সমস্ত টপিক গুলোর উপরেই লেখার চেষ্টা করি । ”জনতা ব্লগ” এর অন্যান্য লেখকদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই তাদের মুল্যবান প্রকাশনা গুলোর জন্য । একটা ব্লগের সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ হলো সেই ব্লগ এর নিয়মিত যারা লেখক এবং পাঠক আছেন, তাহাদের অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য। তাই আপনাদের আবারও ধন্যবাদ জানাই ”জনতা ব্লগ” এর হাতে হাত রেখে পাশাপাশি চলার জন্য । আপনারা পাশে আছেন বলেই আমরা এ পর্যন্ত এগিয়ে আসতে পেরেছি ।

Related Posts