বাঙ্গালির ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড, মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড



( মডারেটর )

ফেব্রুয়ারী 11, 2018

ইতিহাস

2

791

বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের এক অন্ধকারতম  অধ্যায় এর নাম মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড:

শেখ মুজিবুর রহমান এর হত্যাকাণ্ড ছিল  মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, শেখ মুজিবুর রহমানকে চক্রান্তপূর্ণভাবে সপরিবারে হত্যার একটি ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল শেখ মুজিবুর এর বাসভবনে গিয়ে একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত করে তাঁকে হত্যা করে।

সেদিন কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এ একরাতেই নিহত হন
২০ জন (শেখ মুজিব, তাঁর স্ত্রী ও তিন পুত্রসহ)
আহত ২ জন

হামলাকারীদের অন্যতম ছিল,
সৈয়দ ফারুক রহমান, খন্দকার আব্দুর রশীদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, মহিউদ্দিন আহমেদ, এ.কে.এম মহিউদ্দিন আহমেদ, শরীফুল হক ডালিম

হত্যাকান্ডের নেপথ্যে:

শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের পিছনে পটভূমি তৈরি
বেশ কয়েকটি কারন ছিল যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারন হল:

শেখ মুজিব কতৃক একনায়কতন্ত্র আবহ সৃষ্টি:

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মুজিবকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। তিনি পাকিস্তান থেকে ইংল্যান্ডের লন্ডন ও ভারতে গমন করেন। সেসময় বাংলাদেশ ভারতের অধিকারে ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। দেশে ফেরার পর মুজিবকে প্রথমে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি অবিলম্বে সকল রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালে অপ্রশমিত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে একটি সাংবিধানিক সংশোধনীবলে বাহ্যত বিরোধী ছাড়া মুজিব রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠনের মাধ্যমে তাঁর এক দলের শাসনের ঘোষণার সাথে সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও সকল রাজনৈতিক দল বিরোধিতা করে। মুজিবের একনায়কতন্ত্র ব্যাপক প্রহরতা ও বিচার বিভাগের অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত হয়। তেজস্বী দুর্নীতি এবং খাদ্য সরবরাহে ত্রুটি ও খাদ্যাভাবের ফলে সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হলে দেশ বিশৃঙ্খলায় পতিত হয়। জাতীয়করণ কোনো বাস্তব অগ্রগতি সাধনে ব্যর্থ হয়। মুজিবের দুর্বল সরকারের কোনো নির্দিষ্ট পন্থা ছিল না এবং দেশ দেউলিয়া হওয়ার প্রান্তে উপনীত হয়। লরেন্স লিফশুলজ তাঁর “ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ” বইয়ে লিখেন যে বাংলাদেশীদের দুর্নীতি, অপকর্ম এবং জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের চিন্তা নজিরবিহীন ছিল।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী ছিল ১৯৭২ সালে গঠিত একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রাজনৈতিক মিলিশিয়া বাহিনী যা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনুগত ছিল। এটি বেসামরিক জনগণের কাছ থেকে অস্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য গঠিত হলেও প্রকৃতপক্ষে মুজিবের সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত হওয়া থেকে রক্ষা করতে কাজ করে।জাতীয় রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ও মুজিবুরের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বামপন্থী শক্তির উত্থান সম্পাদনা:

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে উদীয়মান বামপন্থী শক্তি মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অনেকটা দায়ী।[
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে বিভক্ত হয়ে একটি অংশ নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হয়।

কর্নেল আবু তাহের ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদের সশস্ত্র শাখা, গণবাহিনী সরকারের সমর্থক, আওয়ামী লীগের সদস্য ও পুলিশদের হত্যার মাধ্যমে অভ্যূত্থানে লিপ্ত হয়।এর ফলে দেশের আইন শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ভাঙ্গন ধরে এবং মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

চক্রান্তকারীগণ

কর্নেল (সেই সময়ে মেজর) সৈয়দ ফারুক রহমান, খন্দকার আবদুর রশীদ, শরীফুল হক (ডালিম), মহিউদ্দিন আহমেদ, এ.কে.এম মহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা এবং এস.এইচ.এম.বি নূর চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেজর ছিলেন। বিদেশি গোয়েন্দাদের থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাঁরা সরকারকে উৎখাত করে নিজেদের সামরিক সরকারের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে। মুজিবের মন্ত্রীপরিষদের আওয়ামী লীগের একজন মন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণে সম্মত হন। তবে মোশতাক ও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি চক্রান্তে জড়িত ছিল বলে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ দাবি করেন। কথিত আছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স এবং এয়ার ভাইস মার্শাল আমিনুল ইসলাম খান মুজিব হত্যার চক্রান্ত সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।

ঘটনাপ্রবাহ,  কি হয়েছিল, সেদিন……

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে ষড়যন্ত্রকারীরা চারটি দলে বিভক্ত হয়। এদের একদল ছিল মেজর হুদার অধীনে বেঙ্গল লেন্সারের ফার্স্ট আর্মড ডিভিশন ও ৫৩৫ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা যারা মুজিবের বাসভবন আক্রমণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থানরত আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদদাতা সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত তাঁর “মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা” বইয়ে লিখেন যে, মুজিব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বর্ণনা সবসময় রহস্যে ঘনীভূত থাকবে। তিনি আরও লিখেন যে, মুজিবের বাসভবনের রক্ষায় নিয়োজিত আর্মি প্লাটুন প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করে না। মুজিবের পুত্র, শেখ কামালকে নিচতলার অভ্যর্থনা এলাকায় গুলি করা হয়।মুজিবকে পদত্যাগ করা ও তাঁকে এ বিষয়ে বিবেচনা করার জন্য বলা হয়। মুজিব সামরিক বাহিনীর প্রধান, কর্নেল জামিলকে টেলিফোন করে সাহায্য চান। জামিল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সৈন্যদের সেনানিবাসে ফিরে যাওয়ার জন্য আদেশ দিলে তাঁকে সেখানে গুলি করে মারা হয়। মুজিবকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুজিবের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (উপরের তলায় হত্যা করা হয়), মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসের, দুইজন চাকর (শৌচাগারে হত্যা করা হয়); শেখ জামাল, ১০ বছর বয়সী শেখ রাসেল এবং মুজিবের দুই পুত্রবধুকে হত্যা করা হয়। সেসময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন। তাঁরা ভারত সরকারের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে ভারতে চলে আসেন। তিনি নির্বাসিত অবস্থায় দিল্লীতে বসবাস করতে থাকেন। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ই মে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন করেন।]

দুটি সৈনিক দল মুজিবের ভাইপো ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল হককে (মনি)তাঁর অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রীর সাথে ১৩/১, ধানমন্ডিতে এবং মুজিবের শ্যালক ও সরকারের একজন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকে তাঁর পরিবারের ১৩ জন সদস্যসহ মিন্টু রোডে হত্যা করে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দলটিকে সাভারে সংস্থিত নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত প্রত্যাশিত বিরোধী আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাঠানো হয়। একটি সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর এগারজনের মৃত্যু হলে সরকারের অনুগতরা আত্মসমার্পণ করে।

আওয়ামী লীগের চারজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, সাবেক উপ-রাষ্টপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আ হ ম কামারুজ্জামানকে আটক করা হয়। তিন মাস পরে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বরে তাঁদের সকলকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়।

 হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার এবং ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানীর পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন৷

১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়, সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন[২০]। রায়ে এরই মাধ্যমে ১৩ বছর ধরে চলা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আইনি ও বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।

রায় কার্যকর

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তারা হলেন-

লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)

এছাড়ও এখনো ১২ জনের মধ্যে ছয়জন বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পলাতকরা হলেন কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল মাজেদ

সুত্র: Wikipedia 

আলামিন

লেখক

Related Posts