মানবের শ্রেষ্ঠত্ব ভালবাসায়, ভাল রাখায়



( ব্লগার )

ফেব্রুয়ারী 14, 2018

সাহিত্য ব্লগ

5

1,254

মানবের শ্রেষ্ঠত্ব ভালবাসায়, ভাল রাখায় ।

নিজেদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে দাবী করার প্রবণতাটি মানব জাতির মধ্যে, সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে প্রকট। কেবল জাতিগত ভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করলে অন্তত বুঝতে পারতাম, নাহ, যাক মানব জাতির মধ্যে মানবতা বোধ প্রকট। কিন্তু বাস্তবতা তার উলটো, মানব জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নেই বিভেদ খানা সবচেয়ে বেশী। ধর্ম, বর্ণ, দেশ, জাত, উপজাত, লিঙ্গ, অর্থ এহেন কিছু নেই যার ভিত্তিতে মানব জাতি বিভাজিত হয়নি। দুনিয়া ব্যাপী ধর্মের নামে হানাহানি দেখে বোধ করি দুনিয়া-বাসী ক্লান্ত হয়ে গেছে, তাই হানাহানির নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি-শিয়ার খুনোখুনি। মনে হয়না অন্য কোন প্রাণী এমন সব তুচ্ছ যুক্তিহীন কারণে নিজেদের বিভক্ত করার সাধ্য রাখে। আমি মনে, প্রাণে এবং কর্মে যেহেতু বিজ্ঞানকেই আমার নেশা এবং পেশা হিসেবে নিয়েছি, বিনা প্রশ্নে কোন কিছুই মেনে নেওয়া আমার শাস্ত্রে বারণ। আমার শাস্ত্রমতে তাই প্রশ্ন রাখলাম, ঠিক কোন কোন দিক থেকে কার বা কাদের সাপেক্ষে মানব জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ? অনেক ভেবে ভেবে মনে হল, মানব জাতির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে কেবল তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা যায়। ১. আবেগ এবং সহানুভূতি, ২. বুদ্ধিমত্তা, ৩. শিল্প-সংস্কৃতি। আসুন আজ আবেগ এবং সহানুভূতি নিয়ে একটু আলোচনা করি।

69254life.jpg

আবেগ এবং সহানুভূতি শব্দ দুটিকে আমি প্রচলিত অর্থে মানবতা-বোধ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে পারতাম, কিন্তু নিউরো-সায়েন্সের ছাত্রী হয়ে অন্যান্য প্রাণীদের আচরণ দেখে-শুনে সহানুভূতি(এম্প্যাথি) নামের দারুণ ব্যাপারটাকে কেবল মানবেরই এক তরফা বলে চালিয়ে দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। বিবর্তনের স্রোতে আজ অবধি প্রাণীর যে আদিম প্রবণতা টিকে রয়েছে, তা হল আবেগ। বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে সফলভাবে বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা থেকেই আবেগের উদ্ভব। আমার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা যদি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবেগ হিসেবে ব্যাখ্যা করি, তাহলে এককোষী অ্যামিবার বেঁচে থাকার চেষ্টাটাকেও একইরকম আবেগময় ব্যাপার হিসেবে দেখা যায়। অ্যামিবার পরিপার্শ্বের অবস্থা বা বিপদ বোঝার জন্য আমার মতো চোখ, কান নেই বটে, তবে তার কোষ পর্দার আছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, আর তাতেই সে তার বেঁচে থাকার প্রবণতা থেকে সেখান থেকে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারে। মানুষ যখন কোন বিপদের মধ্যে পড়ে, সে শারীরিক হোক আর মানসিক, মানুষের দেহে সাথে সাথে হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে, যারা দেহকে বলতে থাকে, যা কিছু তোমার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করছে, তার সাথে লড়াই কর, প্রতিরোধ কর নাহয় সরে যাও! আপনি যখন রাস্তা পেরুতে গিয়ে অপর দিক থেকে ছুটে আসা দ্রুতগামী বাস দেখে আতংকিত হয়ে খুব দ্রুত দৌড়ে রাস্তার অপর পাশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন আর দৌড়াতে দৌড়াতে অনুভব করেন যে কোন মূহুর্তে মরে যাবার আতংক, এই আতংকটাই আপনার হরমোনের ভাষা। রাস্তার ওপারে গিয়েই কিন্তু শেষ নয়, আরও কিছুক্ষণ আপনি ঘোরের মধ্যে, আপনি নিরাপদ কিনা বুঝে উঠতে চেষ্টা করছেন, আবার যদি ছুট দেয়া লাগে, তাহলে তৈরি আছেন, সময় নষ্ট করার সময় নেই, দরকারে এখনি আবার ছুট দেবেন। এই যে আপনার শরীর আর মনের মধ্যে দিয়ে ঘটে গেল একটা ঝড়, এটা মানুষ থেকে শুরু করে জীব জগতের সকল প্রাণের মধ্যে সহজাত, মানুষেরও যেমন, অ্যামিবারও তেমন, গাছেরও তেমন। এখন ঠোঁট উল্টিয়ে বলতেই পারেন, তা কি করে হয়, আমি যেমন ভয়টা পেলাম, অ্যামিবাও কি তেমন করে অনুভব করে নাকি! জী, তাই। আপনার মৃত্যু-ভীতিটা আপনার দেহে ঘটে যাওয়া কিছু জৈবরাসায়নিক পরিবর্তন ছাড়া কিছুই ছিল না, অমন জৈবরাসায়নিক পরিবর্তন অ্যামিবাতেও ঘটে, ঠিক একই রকম পরিবর্তন না হলেও বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতিতে অ্যামিবার যে পরিবর্তন হয় আর ছুটে আসা গাড়ির সামনে আপনার দেহে মনে যে ঝড় হয়, দুটোকেই বলে স্ট্রেস রেসপন্স-দুটোরই লক্ষ্য এক, প্রাণটিকে বাঁচিয়ে রাখা!

এই বেঁচে থাকার প্রবণতা থেকেই আবর্তিত হচ্ছে বাকি সবকিছু, বিবর্তিত হচ্ছে জীব এবং জীবন। নিজে তো বাঁচলেন ছুটে আসা গাড়ির সামনে থেকে, কিন্তু এই জীবন লইয়া আপনি কি করিবেন? এই জীবনের চিহ্ন যদি যুগযুগান্তরে প্রবাহিত নাই করিতে পারিলেন, তাহা হইলে বাঁচিয়া থাকা তো অর্থহীন হইয়া গেলো! সুতরাং আপনার এবং অ্যামিবার দুজনেরই চাই সন্তান সন্ততি। অ্যামিবার নাহয় স্ব-বিভাজনেই সন্তান হয়, আপনি তো আর স্ব-বিভাজন করতে পারেন না। আপনার সন্তানের জন্য লাগবে একজন সঙ্গী, দুজনে মিলেমিশে প্রেমে ভালোবাসায় পৃথিবীতে আনবেন নতুন প্রাণ! এই যে, নাটকের মঞ্চে হাজির হল প্রেম- দেহের মধ্যে আবার হরমোনের স্রোত আর নিউরনে নিউরনে ফায়ারিং। কিন্তু আপনি এখনও জানেন না, অপরজনের মনে আজ আপনাকে দেখে যেই উথাল পাতাল, পরশু অন্য কাউকে দেখে সেই একই উথাল পাতাল হবে কিনা। যাকে দেখে মনের মধ্যে এত ভাবের উচ্ছ্বাস, সে আপনার সন্তানকে ভালবাসবে কিনা, মমতা দিয়ে বড় করবে কিনা, না করলে তো বিপদ! সন্তান মমতা, খাদ্য, উষ্ণতা সবকিছুর অভাবেই মারা যেতে পারে, তখন? তাই আপনিও অস্থির মতি না হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, ধীরে চল! আপনি প্রেমকে ভালোবাসায় পরিণত হবার সময় দিলেন, বুঝে ওঠার চেষ্টা করলেন ইনিই আপনার যোগ্য সঙ্গী কিনা। এর মধ্যে ভালবাসলেন, সেইসাথে ভেবেও বসলেন, পশুপাখিরা কি পারে এমনি করে ভালবাসতে? আমি যেহেতু পারি, তাই আমিই শ্রেষ্ঠ। জী মহাশয়/মহাশয়া, পশুপাখিরাও পারে আমাদেরই মত ভালবাসতে।

null

প্রাণী জগতে মনোগ্যামাস পেয়ার বন্ডিং এবং পলিগ্যামি দুই-ই চলে। কিছু প্রাণী, যেমন প্রেইরী ভোল সারাজীবন সন্তান লালনের জন্য স্ত্রী-পুরুষ একসাথে থাকে। ভেসোপ্রেসিন নামের হরমোনটি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুরুষ প্রেইরী ভোলের দেহের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টরের উপস্থিতি দেখা যায় । অপর দিকে প্রেইরী ভোলেরই আত্মীয় মন্টানে ভোলের দেহে ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টরের মাত্রা খুবই কম, যারা কিনা পারলে প্রত্যেকদিনই সঙ্গী বদলায়। বিজ্ঞানীরা একবার বাড়িয়ে দিল মন্টানে ভোলের ভেসোপ্রেসিনের মাত্রা, আর তাতেই কিনা প্রত্যেকদিন সঙ্গী বদলানো মন্টানে ভোল আগের স্বভাব ছেড়ে একজন সঙ্গীর সাথে সময় কাটাতে লাগল। উলটো পরীক্ষা যদি প্রেইরী ভোলের সাথে করা হয়, ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর গুলো যদি ড্রাগ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন প্রেইরী ভোল কিনা সারাজীবনের সঙ্গী বাদ দিয়ে অন্য সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। তার মানে হল, একটা দীর্ঘমেয়াদী দাম্পত্য সম্পর্ক, যা সন্তান-সন্ততি বড় করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রেম নয়, ভালোবাসা – তা নির্ভরশীল হরমোনের মাত্রার উপর। প্রশ্ন জাগে, মানুষ কি প্রেইরী ভোল নাকি মন্টানে ভোল? একদিকে আরব শেখেদের শ’খানেক পত্নী-উপপত্নী দেখলে মনে হয় মন্টানে ভোল, আবার সারাজীবন এক ছাদের তলে সুখে শান্তিতে কাটিয়ে দেয়া মানুষ দেখলে তো মনে হয় প্রেইরী ভোল, খুবই দ্বিধায় পড়ে যাবার মত ব্যাপার। আসলে মানুষ দুটোর কোনটাই না। মানুষের অবস্থা মনে হয় দুইয়ের মাঝে, সাম্যাবস্থা থেকে যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তার হয়ত ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর একটু বেশী, শুধু তাই নয়, এর সাথে জড়িত আছে অক্সিটোসিন আর ডোপামিন নামে আর দুই নিউরোট্রান্সমিটার, যা দেয় আনন্দের অনুভূতি। আর যার পর্যাপ্ত ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টরের অভাবে, বা ভেসোপ্রেসিনের মাত্রা কমে যাওয়ায় কাউকেই বেশীদিন মনে ধরে না, তার জন্য মায়াই হয়, বেচারা/বেচারির সন্তানের বেঁচে থাকা বা ভাল ভাবে বড় হওয়ার সম্ভাবনা তো কমে যায় বটেই, অক্সিটোসিন আর ডোপামিনের কারণে একজন সঙ্গী/সঙ্গিনীকে ভালোবেসে যে আনন্দ পাওয়ার কথা, তা থেকেও বঞ্চিত হয়। দিন শেষে ভালোবাসাও আপনার শরীরের হরমোন আর নিউরোট্রান্সমিটারের ক্রিয়া, এবং এদের মাত্রাও পরিবর্তনশীল। তাহলে দেখা গেলো ভালোবাসাতেও মানুষ কিনা জীবজগতের অন্য প্রাণীদের মতই, শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করার মোক্ষম সুযোগটুকুও হাত ছাড়া হয়ে গেলো!

এবার আসুন, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে একটু ভাবি। আপনি যদি মন্টানে ভোলের মত লাসভেগাস-বাসী হন, তাহলে তো কথাই নেই। আপনার সন্তান নিয়ে কাজ নেই। আর সন্তান যদি হয়েই থাকে তাহলে তাকে খুব সম্ভবত তাদের মাই (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই-কেন তা একটু পরেই আলোচনায় আসবে) খাওয়াচ্ছে পরাচ্ছে, স্নেহ মমতা দিয়ে বড় করছে। আপনাকে নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ, আপনার জন্য লাস-ভেগাস।

সন্তান জন্মের সাথে সাথে মায়ের শরীরে হরমোনের পরিবর্তন হয়, তখন সন্তানকে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, শরীর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তা করার জন্য। সন্তানের জন্য স্তনের দুধ তার একটি, সন্তানের খাদ্যের ব্যবস্থা শরীর করে ফেলেছে। সেই সাথে দরকার তার যতন। মায়ের মস্তিষ্কে সন্তান জন্মের পর থেকেই অসংখ্য পরিবর্তন হতে শুরু করে, বিশেষ করে অ্যামিগডালা, যা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, নেমে পড়ে সন্তানের সুরক্ষায়। এইযে মায়ের যত্ন, ভালোবাসায় মমতায়, সন্তান চব্বিশটা ঘণ্টা ভালো আছে কিনা, এইসব দেখার ভার সেই নিউরাল সার্কিটেরই। সন্তানের হাসি এবং কান্না দুটোরই গুরুত্বই বাড়িয়ে তোলা এই নিউরাল সার্কিটের কাজ, মায়ের দুশ্চিন্তারও উৎস এই সার্কিটই [4]। এইটুকু পড়ে যারা ভেবে বসলেন, সন্তান পালন তো মায়েরই কাজ তাহলে, প্রকৃতিই দিয়েছে মাকে এই কাজ, পুরুষেরা লাস-ভেগাস যেতেই পারে, এইবার তারা একটু বসুন। যারা সন্তানের ভার সন্তানের মায়ের উপর ছেড়ে দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ান, তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে কম অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ বলব, মানে তিনি অনুভূতির দিক থেকে একজন উন-মানব। প্রকৃতি একজন নারীকে সন্তান জন্মদানের ভার দিয়েছে, তার খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধেরও ভার দিয়েছে সত্যি, কিন্তু সন্তান পালনের ভার প্রকৃতি একলা মাকে দেয়নি। যে পিতা সন্তানের দেখাশোনা, আদর যত্ন করে, তার মস্তিষ্কে দেখা যায় মায়ের মস্তিষ্কের মতই পরিবর্তন [5,6]। এই পরিবর্তনটা ঘটে সন্তানের সাথে বন্ধনের ভিত্তিতে। যে পুরুষ ভাবেন, সন্তানের দেখভালের জন্য আছে মা, আমি দিন রাত কাজ নিয়ে পড়ে থাকবো, বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি করব, অথবা লাস-ভেগাসে একটা ট্যুর দিয়ে আসব, তার সাথে মূলত সন্তানের বন্ধনই হয় কম। তিনি সন্তানের জন্মে একজন স্পার্ম ডোনারই রয়ে যান, বাবা হন না কখনই। একজন পুরুষ তখনই বাবা হন, যখন তিনি সন্তানের মায়ের মতই সন্তানের প্রতি যত্নশীল হন, সন্তানের সাথে বন্ধন বাবা এবং মায়ের দুজনের মস্তিষ্কের একই রকমের পরিবর্তন ঘটায়। মূলত ব্রেইন একটিভিটি বলে দিতে পারে কে বাবা আর কে স্পার্ম ডোনার! একই ঘটনা ঘটে মায়ের সাথেও, মা যদি জন্মের পরে সন্তানকে যত্ন না নেয়, তাহলে তার মস্তিষ্কও হতে পারে অযত্নশীল পিতার মত। দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের দেশে সন্তান লালন যেভাবে মায়ের কাজ বলে সামাজিকভাবে চর্চা করা হয়, তাতে অধিকাংশ পিতাই কোনদিন বাবা হয়ে উঠতে পারে না, স্পার্ম ডোনারই রয়ে যান। যাক সে কথা, পিতার প্যারেন্টাল বিহেভিয়ার নিয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ হচ্ছে, করছে আমাদেরই এক ডক্টরাল গবেষক, সে কাজ করছে ইঁদূরের উপর। তার গবেষণা বলে প্যারেন্টাল বিহেভিয়ার বাবা ইঁদুরে মা ইদূরের মতই হিপোক্যাম্পাসের স্পাইন ডেনসিটি বাড়িয়ে দেয় [7]। হিপোক্যাম্পাস হল মস্তিষ্কের সৃত্মি-কেন্দ্র। সৃত্মি এবং আবেগ যে একে-অপরের সাথে অতোপ্রোতভাবে জড়িত সে ত সবারই জানা, কার্যত হিপোক্যাম্পাস আর অ্যামিগডালা পরস্পরকে কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে এবং যৌথভাবে সন্তানের সাথে প্যারেন্টের (মা বা বাবার) আবেগময় বন্ধন গড়ে তোলে। তাহলে দেখুন সন্তানকে ভালোবাসাতেও কিনা আমরা ইঁদূরের সমকক্ষ, সেখানেও পারলাম না শ্রেষ্ঠ হতে!

মানুষের যা কিছু মানবীয় বলে ভাবি আমরা কেবল সেটুকু নিয়ে কিঞ্চিত আলোকপাত করলাম, খুনোখুনি, হিংস্রতা না হয় বাদই দিলাম। মানবীয় গুণগুলো সবই কিন্তু এসেছে বিবর্তনের হাত ধরে, হাজার হাজার বছরের বিবর্তনে এগুলোকে টিকে আছে কেবল প্রজাতির বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। যে অসংখ্য প্রজাতি আজ অবধি এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে, তার সব ক’টিকে টিকে থাকার যোগ্য হতে হয়েছে ভালোবাসার বন্ধনে, নিজেকে ভালোবাসায়, সঙ্গীকে ভালোবাসায় অথবা সন্তানকে ভালোবাসায়। এই বন্ধনগুলোই তৈরী করে সামাজিক সম্পর্কের বুনন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ জীবন, জীবনকে বাঁচিয়ে রাখা, প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে হবে জীবনকেই। বেবুনের সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে রবার্ট সাপলস্কির একটি বই আছে, “A Primate’s Memoir: A Neuroscientist’s Unconventional Life Among the Baboons”, বইটি পড়লে বোঝা যায়, আমাদেরই মত জটিল সামাজিক জীবন যাপন করে বেবুনেরা, এমন আরও অনেক প্রাণীরই সামাজিক বন্ধন, শ্রেষ্ঠত্ব, আনুগত্যের ব্যাপার আছে, তবে বোধ করি আমাদের মত নির্বোধ কেউই নেই যারা ধর্মের নামে চোখের পলকে শয়ে শয়ে মানুষ মেরে ফেলে। মেরে ফেলে ভাবে, খুব বুঝি জিতে গেলাম আমরা, কিন্তু বুঝতে পারে না, হেরে যাচ্ছে জীবন এখানে, হেরে যাচ্ছে তারই অনাগত প্রজন্ম। ইতিহাস কথা বলে, যে আজ চাপাতি চালাচ্ছে, সে সমাজের ঘৃণা কুড়চ্ছে, একদিন তাকে, তার সন্তানকে মানব সমাজ পুড়িয়ে ছারখার করবে, যেমনি করছে ৭১এর যুদ্ধাপরাধীদের। এইটাই সমাজের নিয়ম, যে জীবনের বিপক্ষে দাড়ায়, জীবনকে অস্থিতিশীল করে, সমাজের বিবর্তনে তাকে একদিন সমাজের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, হবে। এভাবেই মানব সমাজে মরতে মরতে হলেও ভালোবাসা টিকে থাকবে, বন্ধন টিকে থাকবে, শুভ-বোধ টিকে থাকবে, মানব সমাজ টিকে থাকবে-বিবর্তনের স্রোতে মানব-প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত!

মুক্তমনা ব্লগ থেকে সংগ্রহীত ।

ইফতিয়া

“ ছেলেটি তার বিছানা গুছিয়ে না রাখলে মা খুশি হয়, দেখতে পায় একটি পুরুষের জন্ম হচ্ছে; কিন্তু মেয়েটি বিছানা না গোছালে একটি নারীর মৃত্যু দেখে মা আতংকিত হয়ে পড়ে ”

Related Posts