১৯৭১: আকাশপথে বিজয় রথের গল্প অপারেশন ক্যাকটাস



( মডারেটর )

জানুয়ারী 6, 2018

বিনোদন

6

1,758

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে অজস্র প্রাণ, ত্যাগ, রক্ত ও অবর্ণনীয় কষ্টের বিনিময়ে। নয় মাসব্যাপী মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, গড়েছেন স্বাধীন সোনার বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ সময়টিতেই ভারতের অংশগ্রহণ ছিল পরোক্ষভাবে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধ বেঁধে যায় ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। ৩-১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ দিন ধরে চলা এই ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশী (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান) বিমানবাহিনী মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানে স্থল ও বিমান প্রতিরক্ষাসহ নানাবিধ উদ্দেশ্যে যে বিমান অপারেশন পরিচালনা করে তা অপারেশন ক্যাকটাস লিলি (১,২,৩) নামে পরিচিত। অপারেশন ক্যাকটাস লিলিই এই লেখনীর প্রতিপাদ্য বিষয়।

বিমানযুদ্ধ: ৩-৪ ডিসেম্বর

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে যশোর, চট্টগ্রাম, তেজগাঁও এবং কুর্মিটোলায় বিমান হামলা শুরু হয়। আক্রমণ শুরুর কৃতিত্ব নব্যগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে (কিলোফ্লাইট) দেয়া হয়। অটার বিমান ও অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার সম্বল করে নবীন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ‘কিলো ফ্লাইট’ চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জে সফলতার সাথে আক্রমণ করে। এদিকে ভারতীয় বিমানবাহিনী ক্যানবেরা বিমানবহর নিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে আক্রমণ করে। সে সময় সেখানে মোতায়েন থাকা ১৪ নং পাকিস্তান এয়ারফোর্সের অধীনে তখন শুধুমাত্র স্যাবর বিমান ছিলো, যেগুলো দিয়ে রাতে লড়াই করা সম্ভব ছিল না, কাজেই বিমানগুলোর সামনে বাধা বলতে ছিল পাকিস্তান লাইট এক-এক রেজিমেন্টের বন্দুকগুলো।

‘কিলো ফ্লাইটের’ সদস্যবৃন্দ। ছবিসূত্র- coloursofglory.org

দিনের প্রথম আক্রমণ ১৭ নং স্কোয়াড্রনের অধীনস্থ হকার হান্টার বিমানের দ্বারা শুরু হয়। হকার হান্টারগুলোকে সুরক্ষা দিয়ে যায় ২৮ নং স্কোয়াড্রনের মিগ-২১ বিমানগুলো। তবে আখেরে এটি অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত হয়। হান্টারগুলো লড়াই শুরুর পূর্বে বাধাদানকারী একটি স্যাবর বিমানকে ভূলুণ্ঠিত করে। ১৪ নং স্কোয়াড্রন কুর্মিটোলা এয়ারফিল্ড বেজ এর হ্যাঙ্গার এবং স্থাপনাগুলোতে রকেট চালিয়ে আক্রমণ করে। সেদিন বিকেলেই নারায়ণগঞ্জের জ্বালানি ডিপো এবং ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়ে আক্রমণ করা হয়। বিকেলে তেজগাঁও বিমানবন্দরে করা আক্রমণে অংশ নেয়া ২৮ নং স্কোয়াড্রনের মিগ বিমানগুলো একটি টুইন অটার বিমানকে ধ্বংস ও ভূলুণ্ঠিত করে।

৪ ডিসেম্বরের সকালের মধ্যে ৭, ১৪, ১৭, ৩৭ নং স্কোয়াড্রনের হকার হান্টার বিমান, ২২১ নং স্কোয়াড্রনের সুকয়-৭ এবং ২৮ নং স্কোয়াড্রনের মিগ-২১ এর উপর তেজগাঁও আক্রমণের মিশন ন্যস্ত করা হয়। ৪ তারিখ সকাল থেকেই হকার হান্টার এবং সুকয় বিমানগুলো হামলা করতে থাকে এবং তাদের সুরক্ষা দিয়ে যায় মিগ-২১ বিমানগুলো। সারাদিনে মোট ১০৯টি বিমান ওড়ার পর রাতে ক্যানবেরাগুলো পুনরায় বিমানঘাঁটিগুলোতে পাঁচ দফায় আক্রমণ করে বোমাবর্ষণ করে। কিন্তু তেজগাঁও, কুর্মিটোলা ও চট্টগ্রামে করা ৩-৪ ডিসেম্বরের আক্রমণগুলো আশানুরূপ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি।

যার জন্য দু’টি কারণ দায়ী: ৪ ডিসেম্বরের আক্রমণের সময় পিএএফ বিমানঘাঁটিগুলোতে সক্রিয় ছিল এবং আক্রমণ ছিল অনিখুঁত। এবং দ্বিতীয় কারণটি ছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীর হওয়া ক্ষয়ক্ষতি। এই আক্রমণের সময় আইএএফ ৪টি হান্টার এবং একটি করে সুকয়-৭ এস ও ক্যানবেরা বিমান হারায়। এসব কারণে আক্রমণসমূহের ইচ্ছানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের শেষে চীফ মার্শাল পি. সি. লালের বক্তব্য থেকে জানা যায়, ইন্টেলিজেন্স থেকে এলাকার কোথায় কী আছে এ সংক্রান্ত তথ্য না পাওয়ায় তারা সঠিক লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে নি। আর বিমানগুলোতে থাকা রকেট দিয়ে রানওয়ের তেমন ক্ষতি করা সম্ভব ছিল না।

পিএএফ ঢাকায় হওয়া যুদ্ধে তিনটি এবং কুর্মিটোলায় দুইটি স্যাবর বিমান খোয়ায়। এর মধ্যে উইং কমান্ডার এস এম আহমেদ এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাঈদ বিমান ছেড়ে গাজীপুরে নিরাপদে থেকে অবতরণ করেন। কিন্তু তাদের সার্চ পার্টি খুঁজে পায়নি, যুদ্ধ চলাকালীন তারা নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরবর্তীতে ধারণা করা হয়, তারা মুক্তিবাহিনীর সমর্থকদের হাতে ধরা পড়েন। যদিও এস এম আহমেদের সেদিন বিমানে ওড়ার কথা ছিল না কিন্তু পিএএফ এর ঐতিহ্য অনুযায়ী, অগ্রজদের তত্ত্বাবধানেই যেহেতু যুদ্ধ পরিচালিত হয় সেহেতু তিনি বিমান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। চারটি হান্টার বিমানের সাথে যুদ্ধরত আহমেদের সামনে কিছু মিগ-২১ এবং সুকয়-৭ এসে পড়লে হান্টারগুলোর অধিনায়ক আহমেদের এফ-৮৬ বিমানটিকে ধরাশায়ী করেন। কুর্মিটোলার ৫ মাইল দূরে বিমান ছেড়ে অবতরণ করেন আহমেদ। এদিকে আরেকজোড়া এফ-৮৬ বিমান তখন কয়েক মাইল দূরে তিনটি হান্টার বিমানের সাথে লড়ছিল।

এই দুটোর একটিতে ছিলেন স্কোয়াড্রন লীডার আফজাল এবং অন্যটিতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাঈদ। একটি হান্টার বিমান সাঈদের বিমানটিকে ধরাশায়ী করার সময় সাঈদ নিরাপদে বিমান ত্যাগ করেন। এক মিনিট পর আফজাল তার বদলা একটি মিগ-২১ কে ধাওয়া ও ধরাশায়ী করার মাধ্যমে নেন। যদিও আহমেদ এবং সাঈদ দুজনেই নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করেন কিন্তু স্থল ও আকাশপথে অনুসন্ধান দলের খোঁজ করা সত্ত্বেও তাদের দেখা মেলেনি। ধারণা করা হয় মুক্তিবাহিনীর সমর্থকদের হাতে ধরা পড়েন তারা। পিএএফের সেদিনকার মতো হারানো শেষ স্যাবর বিমানটি বিকেলে নারায়ণগঞ্জে করা হামলায় ধ্বংস হয়। সে বিমানটিতে থাকা সাজ্জাদ নূর ১৪ নং স্কোয়াড্রনের হান্টারগুলোর সাথে যুদ্ধ করছিলেন। নূরও বিমান থেকে নিরাপদে অবতরণ করলেও আহমেদ এবং সাঈদের মতো পরিণতি তার হয়নি। জিঞ্জিরায় অবতরণের পর তাকে উদ্ধার করা হয়।

এই মিশনে IAF এরও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই মিশনে IAF ছয়টি হান্টার এবং একটি সুকয়-৭ বিমান খোয়ায়। লালমনিরহাটে অস্ত্রভর্তি ট্রেনে হামলা করার সময় দুটি বিমান ভূমি থেকে চালানো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভারতীয় সীমানায় বিধ্বস্ত হয়, একজন পাইলট শহীদ হন। আক্রান্ত বিমানগুলোর একজন পাইলট স্কোয়াড্রন লীডার এস. কে. গুপ্তা (৪) প্লেন ছেড়ে বাগডোগরায় নিরাপদে অবতরণ করেন। বিমানবিধ্বংসী অস্ত্রের মুখে সেদিন ১৪ নং স্কোয়াড্রনও দুটি হান্টার বিমান হারায়, বিমানগুলোর পাইলট স্কোয়াড্রন লীডার কে.ডি.মেহরা এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে.সি.ত্রেমেনহেয়ার বিমান ছেড়ে নিরাপদে অবতরণ করেন। ত্রেমেনহেয়ার শত্রুসেনার হাতে বন্দী হন তবে মেহরা তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে ভারতীয় এলাকায় ফিরে যান। তবে সেদিন সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল ৩৭ নং স্কোয়াড্রন কেননা স্কোয়াড্রন লীডার এস.বি.সামন্ত এবং ফ্লাইং অফিসার এস.জি.খোন্দে নামক তাদের দুই পাইলট শহীদ হন। ২২১ নং স্কোয়াড্রনের সুকয়-৭ বিমান তার পাইলট স্কোয়াড্রন লীডার বি.ভুটানিসহ বিধ্বস্ত হয় এবং তিনিও শত্রুসেনার কবলে পড়েন, যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাকে আটক করা হয়। (৪)

৪ ডিসেম্বরে IAF এর ক্যানবেরা বিমানগুলো চট্টগ্রাম বিমানবন্দর,  শোধনাগার এবং তেলের ডিপোগুলোতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। লক্ষ্যে আঘাত এনে তা ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও সেখানে তারা দুটি বিমান খোয়ায়। সব মিলিয়ে PAF, IAF এর ৪ ডিসেম্বরের অপারেশনের বিরুদ্ধে ৩২টি বিমান নিয়োজিত করে এবং ৩০,০০০ রাউন্ড গোলাবারুদ ব্যয় হয়। ভূমিতে থাকা অস্ত্রগুলো থেকেও ৭০,০০০ রাউন্ডের মতো গুলি চালানো হয় যা কিনা PAF এর ইতিহাসে একদিনে বিমানপ্রতি ব্যয় করা সর্বোচ্চ গোলাবারুদ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তাদের ১০-১২টি বিমান যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয় এবং তারা সামনে লম্বা সময়ব্যপী যুদ্ধ চলতে পারে এই আশঙ্কায় গোলাবারুদ সংরক্ষণ করতে থাকে।

বিমানযুদ্ধ: ৫ ডিসেম্বর

তথাপি ৫ ডিসেম্বর সকালে IAF মিগ-২১ কে ৫০০ কেজি বোমাসহ তেজগাঁও ও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে আক্রমণের ভার দেয়া হয়। এই আক্রমণগুলোকে তারা অত্যন্ত সফলতার সাথে পরিচালনা করে এবং রানওয়েসমূহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে PAF কে পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হয়। এসবের ফলে ভারতীয় নৌজাহাজ ‘ভিক্রান্ত’ এ থাকা ১৮টি হকার সী হক এবং চারটি ব্রিগেট এলাইজ টার্বো প্রপ এন্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার এয়ারক্রাফটসমূহও পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে উপকূলীয় এলাকা সহ কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বন্দরসমূহতে আক্রমণ চালাতে সমর্থ হয়। আকাশপথের সম্পূর্ণ এখতিয়ার নিয়ে নেয়ার পরও তখনো পিএএফ এর স্যাবর বিমানগুলোকে ধ্বংস করা যায়নি। তাই আকাশপথের এই কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য বিমানহামলাগুলো ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়েছিল।

এদিকে ঢাকায় ডিসেম্বরের ৪ ও ৫ তারিখ দুই বিমানবাহিনীর যুদ্ধ খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে ঢাকাবাসীরা। প্রথমে IAF এর পরিকল্পনা ছিল মাটিতে অবস্থিত পাকিস্তানী বিমানগুলো ধ্বংস করা কিন্তু এটির জন্য যেমন বেশ মূল্য চুকাতে হয় তেমনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লক্ষ্যগুলোতে এবং ক্যামোফ্লাজ থাকা অঞ্চলে এটি PAF এর তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয় না। IAf এবং PAF উভয়েই বিমানযুদ্ধের পাশাপাশি ভূমি থেকে সেগুলোকে সহায়তা করার প্রয়াস চালিয়ে যায়। ৫ ডিসেম্বর PAF এর ২০টি স্যাবর বিমান এবং ১২,০০০ রাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়। বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রগুলো ৫ ডিসেম্বর এবং ৬ ডিসেম্বরের ভোর পর্যন্ত ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা সফলভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।

এদিকে ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়ই ভারতীয় বিমানবাহিনী বুঝতে পারে রণকৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।

মিগ-২১ বিমান। ছবিসূত্র- indianairforce.nic.in

৬ ডিসেম্বরের বিমানযুদ্ধ

৬ ডিসেম্বর সকাল, উইং কমান্ডার বি.কে.বিষ্ণই এর অধীনে গৌহাটি থেকে খুবই নিচ দিয়ে (সর্বোচ্চ ৫,০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠে ঘন্টায় ৯০০ কি.মি. গতিতে নিচে দেয়ে আসা) উড়ে আসছিল ২৮ নং স্কোয়াড্রনের ৪টি মিগ-২১ বিমান। ৫০ কেজি বোমা নিয়ে এগুলো তেঁজগাও বিমানবন্দরে হামলা করে এবং রানওয়েতে মুহুর্মুহু হামলা চালিয়ে একে অকার্যকর করে দেয়। বিমানবন্দরটিকে বাঁচাতে আকাশপথে কোনো উদ্যোগ ছিল না তখন, কেননা তখন একটি বিমান PAF এর ভূমি থেকে সাহায্যকারী দল নিয়ে কেবলমাত্র সেখানে নেমেছে এবং সেটি তখনও সেখান থেকে উড়ে চলে যায়নি। রানওয়েতে মারা বোমাগুলো ছিল BETAB-500, যা বিমানের রানওয়ে ধ্বংস করার কাজেই ব্যবহার করা হয়েছিল, বোমাগুলো রানওয়েতে পরস্পর ১২০০ মিটার দূরে অবস্থিত দুইটি খাদের সৃষ্টি করে যেগুলোর প্রত্যেকটি ছিল ১০ মিটার গভীর ও ২০ মিটার চওড়া। ফলে রানওয়েটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।

ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমান হামলার ফল। ছবিসূত্র-indianairforce.nic.in

৭ ডিসেম্বরের বিমানযুদ্ধ

৭ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত কুর্মিটোলা বিমানবন্দর কার্যকর ছিল কিন্তু এরপর ২৮ নং স্কোয়াড্রনের মিগ-২১গুলো পুনরায় রানওয়েতে আঘাত হানে। ৬ ডিসেম্বর সকালে ৭ নং স্কোয়াড্রনকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে পশ্চিম দিকের ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সহায়তার জন্য পাঠানো হলেও মিগ-২১ এবং ১৪ ও ২৮ নং স্কোয়াড্রনের মুহুর্মুহু হামলার মুখে রানওয়েটি খানাখন্দে ভরপুর ও বড় বড় গর্তযুক্ত হয়ে যায়। মিগগুলো ওড়ানো এবং চালিয়ে যুদ্ধ করা এতটা সহজ ছিল না। কিন্তু এর গতি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দেখে সন্তুষ্ট ভারতীয় পাইলটরা কঠিন প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মবিশ্বাস ও প্লেনটিকে চালানোর দক্ষতা অর্জন করেন। (৬) ভারতীয় বিমানবাহিনী তথা IAF এর হামলাগুলোর ফলস্বরূপ পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অংশ ৭ই ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

উপরিউক্ত আক্রমণগুলো ছাড়াও ভারতীয় বিমানবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিত্যক্ত কুমিল্লা, লালমনিরহাট এবং শমসেরনগরের বিমানবন্দরগুলো সহ অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোতেও হামলা চালায়। এতে সড়কপথে সেগুলোতে বয়ে নিয়ে যাওয়া বিমান কিংবা দেশের বাইরে থেকে আসা যে কোনো বিমানের সেখানে এসে পাকিস্তানী বিমানবাহিনীকে সাহায্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে যশোর বিমানবন্দর মুক্তিবাহিনীর এখতিয়ারে চলে আসায় সেটিকে হামলার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। পাকিস্তানী প্রশাসন বারংবার রানওয়েগুলা মেরামতের প্রচেষ্টা করে এবং সেনাবাহিনীর প্রকৌশলী এবং সাধারণ মজুরদের দু’দিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৭ ডিসেম্বর ভোর ৪:৫০ এ তেজগাঁও রানওয়ে মেরামত করা হয়। এটি সম্পূর্ণ কার্যকর করে তুলতে সময় লেগেছিল মোট ৮ ঘণ্টা। IAF বিমানঘাঁটিতে ৭ ডিসেম্বর আক্রমণ চালায় এবং সেটি পুনরায় কার্যকর করতে কোনো প্রকার পুনঃক্ষয়ক্ষতি ছাড়া ৩৬ ঘণ্টার কাজ প্রয়োজন ছিল। IAF নিশ্চিত করেছিল এমন মেরামতের ঘটনা যেন আর না ঘটে।

বিমানযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর প্রচেস্টা ও ক্ষয়ক্ষতির তালিকা। ছবিসূত্র-indiandefencereview.com

৮-৯ ডিসেম্বর

যেহেতু বিমানঘাঁটি পুনরায় কার্যকর করতে কোনোপ্রকার পুনঃক্ষয়ক্ষতি ছাড়া ৩৬ ঘণ্টার কাজ প্রয়োজন ছিল এবং বিমান বিধ্বংসী ইউনিটগুলো এতক্ষণ যাবত্‍ ভারতীয় বিমানবাহিনীকে (IAF) ঠেকিয়ে রাখতে অসমর্থ ছিল কাজেই ৮ ও ৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর পাইলটদেরকে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত পাকবাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করে অস্ত্র, মালামাল ও সেনা পরিবহনের কাজ করতো।

জয়দেবপুরের একটি কারখানায় পাকিস্তানীদের জন্য যুদ্ধের সরঞ্জামাদি অস্ত্রসস্ত্র তৈরি হচ্ছিল। এতে ৮ ও ৯ ডিসেম্বর এবং পুনরায় ১৩ ডিসেম্বর হামলা চালানো হয়। এই আক্রমণে মিগ-২১, হান্টার ও ক্যানবেরা বিমান ছাড়াও এএন-১২ পরিবহন বিমানও অংশ নেয় যেন হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং কারখানাটির সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিশ্চিত হয়। এর মাধ্যমে পাকিস্তানী বাহিনীর অস্ত্রের যোগান হ্রাস পায়।

যুদ্ধজাহাজে অবস্থানরত যুদ্ধবিমান। ছবিসূত্র- youtube.com

৯ ডিসেম্বর ১৯৭১: মেঘনা হেলিব্রিজ অপারেশন

৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনীর ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন এবং ফোর কর্পস মেঘনার তীরবর্তী এলাকা দখলের লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়। এদিকে ঢাকাগামী রাস্তাসমূহ তখন প্রায় বিনা বাধায় অতিক্রম্য ছিল কারণ পাকিস্তানী বাহিনী পিছু হটে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং ব্রিজগুলোতে শক্তি জোরদার করেছিল। তারা ভেবেছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় এরূপ অবস্থান নিলে তারা ততদিন পর্যন্ত মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর মোকাবেলা করে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে যতদিন না (তাদের বিচারে স্বল্প সময়) জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ভারতীয় বাহিনী পিছু হটে নিজেদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

মেঘনা তীরবর্তী অঞ্চল দখলকারী ভারতীয় বাহিনীর ফোর কর্পস অংশের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত্‍ সিং আশুগঞ্জে অবস্থানকালীন বুঝতে পারেন তার বাহিনী যদি ঢাকাগামী বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে এগিয়ে যেতে পারে তাহলে তা ঢাকাকে চাপে ফেলতে সক্ষম। কিন্তু তার জন্য পৌঁছাতে হবে মেঘনার অপর পাড়ে। বিশালাকার মেঘনা প্রস্থে অন্তত ৪০০০ গজ এবং পিছু হটে যাওয়া পাকবাহিনী এর উপর অবস্থিত ২৯৫০ ফুট লম্বা সেতুর দুইটি স্প্যান ধ্বংস করে দিয়ে যায়। তখন নতুন সেতু তৈরি করা ছাড়া অপর পাড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই সগত্‍ সিং এবং ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশনের অধিপতি বি. এফ. গঞ্জালভেস মিলে আকাশপথে সেনা নিয়ে নদী পার হবার সিদ্ধান্ত নেন। (৭)

মেঘনা হেলিব্রিজ। ছবিসূত্র- wikimedia.org

৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আঞ্চলিকভাবে যত উপায় ছিল তা অবলম্বন করে নদীর অপর পাড়ে পৌঁছে ঢাকা যাত্রার জন্য পর্যাপ্ত শক্তির ব্যবস্থা করতে বলা হয়। এদিকে ৯/১০ ডিসেম্বর রাতে প্রায় ১৪টির মতো এমআই-৪ হেলিকপ্টার আনা হয় এবং পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টা যাবত্‍ প্রায় ১১০ বার উড়ে সেনা পারাপারের কাজ করে। এভাবেই আকাশপথেই রচিত হয় অদৃশ্য সেতু তাই অপারেশনটি মেঘনা হেলিব্রিজ নামে পরিচিত। হেলিকপ্টারগুলোর ভার বহনের ক্ষমতা সীমিত ছিল এবং এটি সরঞ্জামাদিসহ বাহিনীর ক্ষুদ্র একাংশকে নিয়েই একবারে উড়তে পারতো। ৩১১ মাউন্টেন ব্রিগেড দলকে প্রথমে অন্যপাড়ের রায়পুরা এলাকায় নেয়া হয় এবং এই দল ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যার মধ্যে মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন দখল করে। ১৯ পাঞ্জাব দল নদী পার হয়ে ভৈরববাজারে অবস্থানরত পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাভূত করে। ফোর গার্ডস দলটি একই সময়ে নরসিংদীর দিকে এগোতে থাকে এবং ১১ ডিসেম্বর তা দখল করে।

১১ ডিসেম্বর ১৯৭১: টাঙ্গাইল প্যারাড্রপ

টাঙ্গাইল ঢাকার ৭০ কিলোমিটার উত্তরের অংশ যা যমুনা ও মেঘনার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ১০১ কমন জোনের সেনাদলের একাংশ এই এলাকায় অগ্রসর হচ্ছিল, তারা ৯ ডিসেম্বর জামালপুর শহরকে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থিত পুংলি ব্রিজ দখল করে পুনঃজোটবদ্ধ পাকিস্তানী বাহিনীকে ফাঁদে ফেলে তাদের অগ্রসরতাকে রদ করা, যাতে তারা ঢাকায় অবস্থিত বাহিনীর সাথে যোগ না দিতে পারে। অন্যান্য এলাকার পাকবাহিনীকে আগেই পাশ কাটিয়ে তাদের ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।

পুর্ব পাকিস্তানের সীমানায় প্রবেশ করছে ভারতীয় বিমানবাহিনী। ছবিসূত্র- indiandefencereview.com

ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকীর অধীনস্ত মুক্তিবাহিনীর একাংশ তখন টাঙ্গাইলের এখতিয়ার নিয়ে রেখেছে। টাঙ্গাইলের উত্তরে প্যারাফিল্ড ব্যাটারি, ইঞ্জিনিয়ার প্লাটুন এবং মেডিকেল দলের সমন্বয়ে সেনার একটি দলকে প্যারাস্যুটের মাধ্যমে অবতরণ করানোর পরিকল্পনা করা হয়। প্যারাড্রপ বা প্যারাস্যুটে অবতরণের তারিখ ধার্য করা হয় ১১ ডিসেম্বর। এটা আশা করা হয়েছিল যে, ভূমিপথে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে অগ্রসরমান সেনারা ৭ দিনের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে টাঙ্গাইল এসে পৌঁছে প্যারাস্যুটে অবতরণকৃত সেনাদের সাথে যোগদান করবে। ভারতীয় বিমানবাহিনী আকাশপথের দখল নিয়ে নেয়ায় দিনের বেলা প্যারাড্রপ সম্ভব হয়েছিল, কেননা আকাশপথে পাকিস্তানী বিমানবাহিনীর কোনোরূপ আক্রমণের শঙ্কা ছিল না। আকাশপথের দখল ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে না থাকলে প্যারাড্রপ দিনের পরিবর্তে রাতে করতে হতো। ৭৮৪ জন সদস্যবিশিষ্ট ২নং প্যারা ব্যাটালিয়নকে (মারাঠা এলআই) প্যারাড্রপের জন্য চূড়ান্ত করা হয়।

সম্পূর্ণ ব্যাপারটি লেফটেন্যান্ট কর্নেল কুলওয়ান্ত সিং পান্নুর অধীনে হয়েছিল। ৪ ডিসেম্বর যথাযথ অবতরণস্থলের খোঁজে ছবি তুলে রাখা হয়। এই অবতরণ স্থল বা ড্রপ জোন (ডি-জেড) প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল। প্যারাড্রপের জন্য ভারতীয় বিমানবাহিনী ২২টি ডাকোটা বিমান, ২০টি প্যাকেট বিমান এবং ছয়টি এএন-১২ বিমানের বন্দোবস্ত করে। প্যারাট্রুপ দলকে দমদম ও কালাইকুন্ড থেকে আকাশপথে নিয়ে আসা হয়। প্যারাড্রপের ব্যাপারে অন্যদের বিভ্রান্ত করার জন্য অবতরণ এলাকার ১৬ কিলোমিটার দূরে অবতরণকারী সেনাদলের নকল প্রতিকৃতি ক্যারিবাউ বিমানে এনে প্যারাস্যুট সহযোগে ফেলা হয়।

১১ ডিসেম্বর সব বন্দোবস্ত করে বিমান সহযোগে সেনাদের প্যারাড্রপের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তার আধ ঘন্টা আগে দুটি প্যাকেট বিমানে করে পথ অনুসন্ধানী দলকে নামিয়ে দেয়া হয় যাতে তারা সঠিক অবতরণস্থল খুঁজে বের করে রাখতে পারে। মাত্র আধা ঘন্টারও কম সময়ে তার সেই কাজটি সম্পাদন করে। পুরো অবতরণ প্রক্রিয়াটি ৫০ মিনিটে সম্পন্ন হয় যা শুরু হয়েছিল এএন-১২ বিমানে বোঝাই ভারী জিনিসগুলো অবতরণের মাধ্যমে। এরপরই প্যাকেটগুলো অন্যান্য মালপত্র ও সেনা নিয়ে অবতরণ করে। ডাকোটা বিমানের পেছনে সেনাসদস্যদের নিয়ে আসা হতো যদিও কোনো কোনোটিতে ২৫০ কেজি ওজনের জিনিসও ছিল।

সবকিছু অবশ্য পরিকল্পনা মোতাবেক বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯ জন সেনাসহ একটি ডাকোটা বিমান কিছু সমস্যার কারণে তাদের গন্তব্যস্থলের ১১ মাইল উত্তরে নামিয়ে দেয় যার ফলে তাদের মূল দলের সাথে যোগ দিতে ২৪ ঘণ্টা লেগে যায়। একটি হাউইতজার ও দুটি জীপবাহী প্যাকেট বিমান তাদের অবতরণস্থলের চার মাইল দক্ষিণে নামিয়ে দেয়। আরেক ঘটনায় চারটি জিপ পুকুরে পড়ে যায়। এছাড়াও একটি এএন-১২ বিমানে ভূমি থেকে গুলি চালানো হয়, তবে তা সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার পায়।  ৪০ জন প্যারাট্রুপারসহ একটি প্যাকেট বিমান ইঞ্জিনগত জটিলতার দরুণ দমদমে ফিরে আসে। পরদিন মালপত্রসহ এই ৪০ জনকে পাঁচটি এএন-১২ বিমানে করে নির্ধারিত অবতরণস্থলে পাঠানো হয়।

হান্টার বিমানগুলো ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করে এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সেখানে উপস্থিত ছিল না। এতে জাহাজে থাকা বিমানগুলোর জন্য আকাশপথ পরিষ্কার হয়ে যায়। এদিকে কর্নেল পান্নু ঢাকাগামী পাকিস্তানীদের জন্য ফাঁদ পাতেন। সেই রাত্রেই পাকিস্তানীদের ওঁতপেতে ধরা হয়। তারা সেদিন রাত ও পরদিন বারবার আক্রমণ করলেও প্রতিবারই ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী সেনারা। অবশেষে, পাকবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাদির ২২৩ জনের মৃত্যুর পর ভারতীয় বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১

পাকবাহিনী সেনারা ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনে আশ্রয় নেয়। ভারতীয় বিমানবাহিনী সে ভবনটিকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম আক্রমণ হিসেবে বেছে নেয়া হয় তীব্র ছোট অস্ত্রের হামলাকে। পরদিন আক্রমণ করে পাকিস্তানীদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়। তবে অন্যান্য ভবনে হানাদার বাহিনী না থাকায় সেগুলো আক্রমণ থেকে নিরাপদ ছিল। বিষ্ণই এবং অন্যান্য পাইলটরা নিখুঁতভাবে আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন।

সেদিন গভর্নর হাউজে গভর্নর এএম মালিকের জরুরি মিটিংয়ে বসার কথা ছিল, মিটিং সম্পর্কে ভারতীয় বিমানবাহিনী মিটিং শুরুর মাত্র ৪৫ মিনিট আগে জানতে পারে। দ্রুত ঢাকার মানচিত্র যোগাড় করে লক্ষ্য নিশ্চিত করা হয় এবং ছয়টি মিগ-২১ বিমান রকেটসহ ওদিকে পাঠানো হয়। মিটিং কক্ষ লক্ষ্য করে রকেট ছোঁড়া হয় এবং এতে গভর্নর মালিকসহ এবং পুরো কেবিনেটের মনোবল ভেঙ্গে যায় এবং তারা পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি তারা মানসিকভাবে পরাজয় মেনে নেয় তারা। যদিও পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজি এত শক্তিশালী বিমানবাহিনী সম্বলিত কঠিন প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হয়ে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে মানসিকভাবে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১

ঢাকা সেনানিবাসে হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। ফলে সেনানিবাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে নিয়াজী ও সেনারা। তারা আশ্রয় নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাতিরপুলের ঘরবাড়িতে। তাদের সেখান থেকে বের করার জন্য শুরু হয় অপারেশন ‘স্ট্রিট ফাইটিং’। ১৬টি মিগ-২১ বিমান ২৫৬টি রকেট ছোঁড়া হয়। সেখানে আক্রমণ করলে তারা পালিয়ে রেডক্রসের সহায়তায় আন্তর্জাতিক হোটেলে আশ্রয় নেয়।

অতঃপর বিমানহামলা চলতে থাকে তেজগাঁও সহ নানান স্থানে। মুহুর্মুহু আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে পাকবাহিনী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান করা হয়। বেতার থেকে উর্দুতে ঘোষণা দেয়া হয়,“ভাইসব! আপানাদেরকে আমরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছি। আপনাদের আর বের হওয়ার কোনো পথ নেই। আপনারা কি নিজের স্ত্রী পুত্র কন্যার সাথে মিলিত হতে চান না? চাইলে যত দ্রুত সম্ভব আত্মসমর্পণ করুন। এক সেপাই আরেক সেপাইর সামনে অস্ত্র সমর্পণ করায় লজ্জার কিছু নেই। আপনারা সময় থাকতে আত্মসমর্পণ করুন।” আকাশ থেকে ছড়িয়ে দেয়া হয় লিফলেট। পরদিন ১৬ই ডিসেম্বর প্রায় ৯৬০০০ সেনাসহ জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেন। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের আগে লেফটেন্যান্ট কর্নেল লিয়াকত বোখারি কিছু অনুচরসহ বার্মা (মায়ানমার) পালিয়ে যান যার মধ্যে মেজর জেনারেল রহিম খান একজন। (৯)

পাকিস্তানি তথ্যমতে ৪-১৫ই ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানবাহিনীর ২২-২৪টি (৭টি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কাছে ও বাকিগুলো বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রের মুখে) বিমান খোয়ায়। যদিও ভারতীয় বিমানবাহিনীর মতে, তারা পূর্ব পাকিস্তানে ১৯টি বিমান খোয়ায় যার তিনটি আকাশযুদ্ধে, ৬টি দুর্ঘটনাবশত এবং বাকিগুলো বিমানবিধ্বংসী অস্ত্রের মুখে ধ্বংস হয়। যদিও এর মধ্যে ৫টি স্যাবর বিমান ভুলবশত ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমান দ্বারাই ভূলুণ্ঠিত হয়। (৮)

অপারেশন ক্যাকটাস লিলি শুধু পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পাকবিমানবাহিনীকে নিষ্ক্রিয়ই করে দেয়নি পাশাপাশি ঘুরিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধের মোড় যা দ্রুত বিজয় ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সকল যোদ্ধাদের অক্লান্ত আত্মত্যাগ ও বীরত্ব এ জাতি সদা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

তথ্যসূত্র-

১) Ranbir Singh Gp Capt (1 January 2009). Major Defence Operations Since 1947. Prabhat Prakashan. pp. 106–. ISBN 978-81-88322-67-1.

২) “When the Cactus Lilly bloomed..” Deccan Herald. Retrieved 28 July 2012.

৩)  D. P. Ramachandran (1 September 2008). Empire’S First Soldiers. Lancer Publishers. pp. 309–. ISBN 978-0-9796174-7-8.

৪) “Indian Air Force losses in the 1971 War”. www.bharat-rakshak.com.

৫) Witness To Surrender, Siddiq salik, page- 131.

৬) “India — Pakistan War, 1971; Introduction”. Tom Cooper & Shais Ali. www.acig.org.

৭)  “Helibridge over the Meghna”. The Liberation Times. 10 December 1971.

৮) Witness To Surrender, Siddiq salik, page- 132.

৯) Witness To Surrender, Siddiq salik, page- 209.

ফিচার ছবিসূত্র- quora.com

সেলিম

লেখক

Related Posts