আড়াই মিনিটের মিশন


5

826

ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকল দুই যুবক। একজনের মাথায় গোল টুপি, অন্যজনের নাক-মুখ মুখোশে ঢাকা।

রাত তখন ৭টা ৪৯ মিনিট ২৭ সেকেন্ড। এর ২৬ সেকেন্ড পর একই ফটক দিয়ে প্রবেশ করে আরো দুই যুবক। তাদেরও একজনের মুখোশ পরা। সাদা শার্ট পরিহিত অপরজনের মুখে কোনো মুখোশ নেই। ফটকে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মী কোনো বাধাই দিল না। প্রধান ফটক পেরিয়ে তারা বাঁ পাশের দরজা দিয়ে ভবনের নিচতলার জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ‘এম এস মুন্সি ওভারসিজে’ ঢোকে। প্রায় আড়াই মিনিট পর দুজন আগে এবং পরপরই অপর দুজন বেরিয়ে যায়। তবে এবার আর মুখোশ ছিল না। হাত-মুখ মুছতে মুছতে চারজন যখন ফটক পেরিয়ে যাচ্ছিল তখন অফিসের ভেতর থেকে চিৎকার শুনে দৌড়ে যায় নিরাপত্তাকর্মী। দেখে ‘এম এস মুন্সি ওভারসিজের’ স্টিলের দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ। দরজা খুলতেই দেখা যায় গুলিবিদ্ধ তিনজনসহ ৯ জন আর্তচিৎকার করছে।

গত মঙ্গলবার এভাবে রাজধানীর বনানীর বি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১১৩ নম্বর ভবনে এম এস মুন্সি ওভারসিজের ভেতরে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সিদ্দিক হোসেন মুন্সি ওরফে এস মুন্সি এবং তাঁর তিন সহকর্মীকে গুলি করে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিষ্ঠানটির ফটকের সিসিটিভি ক্যামেরায় খুনিদের আসা-যাওয়ার এ চিত্র ধরা পড়েছে, যা পর্যবেক্ষণ করে দেখছেন পুলিশের গোয়েন্দারা (ডিবি)। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় নিহত এস মুন্সীর স্ত্রী জোসনা বেগম বাদী হয়ে গতকাল বুধবার বনানী থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চার খুনির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন।

গতকাল পর্যন্ত সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান এবং নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, আর্থিক বিরোধের জের ধরেই খুন করা হয়েছে এস মুন্সিকে। আব্দুল সালাম নামে টাঙ্গাইলের এক দালালের সঙ্গে তাঁর আর্থিক বিরোধ ছিল। ছয় লাখ টাকার দাবিতে বনানী এবং টাঙ্গাইল থানায় এস মুন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন সালাম। এস মুন্সি দুই মাস আগে হুমকির অভিযোগে সালামের বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। উভয়ের বিরোধকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। একই সঙ্গে দুর্বৃত্তদের চাঁদার দাবি পূরণ না হওয়ায় কিংবা টাকা লুটের উদ্দেশ্যে কেউ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না তাও পর্যবেক্ষণ করছেন তদন্তকারীরা। ঘটনার সময় এস মুন্সির অফিসের ভেতরে ৯ কর্মী ছিলেন। তাঁদের তিনজন কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, বিদেশে যেতে আগ্রহী—এমন পরিচয়েই প্রথম দুজন ভেতরে ঢোকে। বাকি দুজন ঢোকার পর খুনিদের মধ্যে দুজন জানতে চায়, মালিক এস মুন্সি কে? আবার একজন বলে, আমরা ডন ভাইয়ের লোক। একজন টাকার লকার খোলার চেষ্টা করে। সবাইকে অফিসের ভেতরে এক পাশে আটকে গুলি করে। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল এস মুন্সি। তিনজন একদিকে অস্ত্র তাক করে গুলি করার পর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে যায়। খুনিরা বনানী কবরস্থান রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, অফিসের ভেতর থেকে কোনো টাকা লুট করেনি খুনিরা। গতকাল পর্যন্ত এস মুন্সি বা তাঁর স্বজনদের কাছে চাঁদা দাবির কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এস এম মোস্তাক আহমেদ খান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আর্থিক, ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কোনো বিরোধ আছে কি না যাচাই করা হচ্ছে। তবে অফিস থেকে কিছু লুট হয়েছে বলে জানা যায়নি। খুনিরা চারজন ছিল। তারা কারা, কিভাবে এলো-গেল—সবই আমরা খতিয়ে দেখছি। ’

ডিবি পুলিশের উত্তর বিভাগের একটি দল এম এস মুন্সি ওভারসিজের ফটকের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে। পাশাপাশি অন্তত ছয়জনের সঙ্গে কথাও বলছে বনানী থানা ও ডিবির দল।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. শাহজাহান সাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চার খুনি ছোট মুখোশ পরে এসেছিল। তাদের চেহারা দেখা গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। ’

ডিবির একটি সূত্র জানায়, ফুটেজ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে খুনিরা এম এস ওভারসিজে মাত্র আড়াই মিনিট অবস্থান করে। এর মধ্যে গুলি চালিয়ে চলে যায়। তারা পয়েন্ট ৩২ বোরের গুলির আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। হত্যার ধরন দেখে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, খুনিরা ভাড়াটে। তাদের লক্ষ্য ছিল এস মুন্সিকে হত্যা করা।

এস মুন্সির জামাতা ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপক আবু হানিফ বলেন, ‘টাঙ্গাইলের সালাম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে ঝামেলা ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে জিডিও করেছিলেন তিনি (এস মুন্সী)। এ ছাড়া আমার কিছু জানা নেই। ’

এম এস মুন্সী ওভারসিজের আরেক কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, আব্দুস সালামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে। তিনি এস মুন্সির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করেন। এদের এজেন্ট বা দালাল বলা হয়। এক বছর আগে সৌদি আরবে লোক পাঠানোর সময় সাত লাখ টাকা করে নেন এস মুন্সী। পরে ছয় লাখ টাকা করে দেওয়ার দাবি করেন সালাম এবং আগে দেওয়া প্রায় ছয় লাখ টাকা ফেরত চান। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। প্রায় ছয় মাস আগে তিনি টাকার দাবিতে বনানী থানা এবং টাঙ্গাইল থানায় মামলা করেন। এর পরও টাকা চেয়ে হুমকি দেন সালাম। দুই মাস আগে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় জিডি করেন এস মুন্সী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও এস মুন্সির কর্মী আবু জাফর বলেন, ‘রাতে আমরা অফিসে বসে ছিলাম। হঠাৎ চারজন এসে হামলা করে। তারা গেটে বসে থাকা আলী হোসেন ও গাড়িচালক এনামুলকেও ভেতরে নিয়ে আসে। এরপর মালিক কে জানতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। ’ আলী হোসেন ও এনামুলকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

আরেক কর্মী হোসেন আহম্মেদ বলেন, চারজনের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল ছিল। ভেতরে ঢুকেই একজন বলে, ‘তোদের বস কই?’ তখন স্যার বলেন, ‘আপনারা কারা?’ তাদের একজন বলে, ‘আমরা ডন ভাইয়ের লোক। কালকের মধ্যে ২০ লাখ টাকা নিয়ে দেখা করবি। ’ এরপর গুলি করে এবং বাইরে থেকে দরজা আটকে চলে যায়।

ডিবির একাধিক সূত্র জানায়, নিরাপত্তাকর্মী আল বিনোদ বাজী, আলী হোসেন, গাড়িচালক এনামুলসহ কয়েকজন খুনিদের চেহারা আংশিক কিংবা পুরোপুরি দেখেছেন। বাজী পুলিশকে জানান, খুনিরা ঢোকার সময় মুখোশ দেখে তিনি সন্দেহ করেননি। কারণ ধুলার কারণে অনেকে এ ধরনের মুখোশ ব্যবহার করে। ভেতরে গুলির শব্দও তিনি পাননি। খুনিরা চলে গেলে তিনি দরজার আঘাত ও চিৎকারের শব্দ পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ভেতরে গুলির শব্দ হয়েছে। দুই দরজা ও বদ্ধ কক্ষের কারণে শব্দ বাইরে আসেনি।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, সালামকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে আর্থিক আর কোনো লেনদেনের বিরোধ বা চাঁদাবাজির ঘটনা আছে কি না দেখা হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের অফিসে চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। অনেকে নীরবে টাকা দেন।

গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ১১৩ নম্বর ভবনটি চারতলা। ভবনটির মাঝে দেয়াল দিয়ে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর পাশের ফটক দিয়ে ঢুকে নিচতলার বাঁ পাশেই এম এস মুন্সি ওভারসিজ। এখন প্রতিষ্ঠানটির দরজায় তালা ঝুলছে। মো. আলী নামে সেখানকার এক কর্মী জানান, উত্তর পাশের অংশে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং কিছু সাব-এজেন্ট অফিস আছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আছে নোমানী অ্যাসোসিয়েট। আর দক্ষিণ পাশের অংশে আছে মূসা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান, যেটির মালিকানা ভবন মালিকের। মঙ্গলবার রাতে উত্তর পাশের ফটকে দায়িত্ব পালন করছিলেন নিরাপত্তাকর্মী আলবিনোদ বাজী এবং এম এস মুন্সি ওভারসিজের ফটকে ছিলেন আলী হোসেন। এ দুজনকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মূসা ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল গালিব বলেন, ‘সাত-আট বছর ধরে এস মুন্সি সাহেবের সঙ্গে আমরা ব্যবসা করি। ধামসি, ক্যাথারসিস, রাব্বী গ্রিনল্যান্ড, তুর্কিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতেন তিনি। আগে তিনি বায়রার মহাসচিব ও ক্যাথারসিসের মালিক রুহুল আমিন স্বপন সাহেবের ভবনে ভাড়া ছিলেন। সাড়ে তিন বছর ধরে তিনি আমাদের এখানে অফিস নিয়েছেন। তাঁর লেনদেন ও কর্মকাণ্ড পরিষ্কার ছিল। রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসায় সামান্য লেনদেনের ঝামেলা হতে পারে। কখনো বড় কোনো ঝামেলা শুনিনি। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এই পাশের অফিস সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়। আর মুন্সি সাহেব রাত ৯টা পর্যন্তও থাকতেন। অন্য অফিসগুলোও এমন সময় খোলা থাকে। আমরা অফিসে ছিলাম না। তবে নিরাপত্তাকর্মীসহ যারা দু-একজন ছিল তারাও প্রথমে টের পায়নি। শব্দও পায়নি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে গালিব বলেন, ‘আমাদের ভবনের একটি সিসি ক্যামেরা, যেটি মুন্সির গেটে ছিল সেটি চালু ছিল। ওই ক্যামেরার মেশিন পুলিশ নিয়ে গেছে। ’

গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে এস মুন্সির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ঢাকা মেডিক্যালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, দুটি গুলিতে এস মুন্সি নিহত হয়েছেন। একটি গুলি তাঁর বাহুর বাঁ পাশ দিয়ে লেগে ডান পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। অন্যটি বুকের বাঁ পাশ দিয়ে ঢুকে ডান পাশে আটকে ছিল। সেটি বের করা হয়েছে।

ভাইয়ের লাশ বুঝে নিতে এসে এস মুন্সির ছোট ভাই আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের সঙ্গে কারো কোনো ঝামেলার কথা জানি না। আমরা গ্রামে থাকি। আমাদের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর পারঙ্গী মধ্যপাড়ায়। ’ চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে এস মুন্সি ছিলেন চতুর্থ। তিনি উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন।

গতকাল বিকেলে ইস্কাটন রোডে বায়রা অফিসের সামনে এস মুন্সির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে দাফনের জন্য লাশ টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মঙ্গলবার গুলিবিদ্ধ অন্য তিন কর্মী এখন শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

Related Posts