সমঝোতা আর আপস করতে করতে আমি ক্লান্ত



( মডারেটর )

নভেম্বর 16, 2017

সেলিব্রেটিদের কথা

7

435

 
উত্তরার একটি হাসপাতালের কেবিন। টোকা দিতেই দরজা খুলে দিলেন অভিনেতা মোশাররফ করিম। অক্টোবরের শেষ কয়েক দিন এই কেবিনের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। কথা ছিল, অভিনয়জীবনের ১২ বছর পূর্ণ হওয়া নিয়ে কথা বলবেন প্রথম আলোর সঙ্গে। হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় সবকিছু গড়বড় হয়ে যায়। একটু সুস্থ হয়ে যখন ডাক্তারের পরামর্শে হাসপাতালেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখনই সুযোগ মিলল। কেবিনের বারান্দায় বসে কথা হয় মোশাররফ করিমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হাবিবুল্লাহ সিদ্দিক


পুরোদমে অভিনয়ের ১২ বছর পার করলেন। কী অনুভব করছেন?

কোন দিক দিয়ে পার হয়ে গেল বুঝিনি। মনে হয়, এই তো সেদিন কাজ শুরু করলাম। কিন্তু ১২ বছরের ব্যাপারটা যখন চিন্তা করি, তখন আসলে বিস্মিত হই।

যত দূর জানি, আপনার প্রথম নাটক ‘অতিথি’ ১৯৯৯ সালে বিটিভিতে প্রচারিত হয়। কিন্তু আপনি বলছেন, অভিনয়জীবনের এক যুগ পার করলেন।

আমার প্রথম নাটক ‘স্বপ্নের পাঠশালা’। যত দূর মনে পড়ে, সুমন আনোয়ার ও অনন্ত হিরার রচনা ও পরিচালনা ছিল নাটকটি। এটি প্রচারিত হয়েছে অনেক পরে। তারপর টুকটাক কাজ করেছি। অন্য কাজের ফাঁকে অভিনয়। তাই পুরোদস্তুর অভিনেতা বলা যাবে না। ‘অতিথি’ও ওই সময় করা। টুকটাক যা-ই করতাম, সেগুলো হয় চাকর, না–হয় নায়কের বন্ধুজাতীয় কোনো চরিত্র। খুব মন খারাপ হতো। এ কারণে একসময় ভেবেছিলাম, অভিনয়ই আর করব না। মাঝের দু-তিন বছর করিনি। তখন কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতাম। পুরোপুরি অভিনয় শুরু করলাম ২০০৫ সালের দিকে। ঈদুল ফিতরে করলাম ‘হেফাজ ভাই’এবং ঈদুল আজহায় ‘ক্যারম’। দুটি নাটকই বেশ পছন্দ করল সবাই। তখনই অভিনয়ে মনোযোগী হলাম। সেই হিসেবে অভিনয়জীবনের ১২ বছর পার করছি বলা যায়।

কোনো কিছুর জন্য আফসোস হয়?

(একটু ভেবে) আমার ব্যক্তিগত পাওয়া না পাওয়ার চেয়েও মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতি বিশেষ করে নাটকের অবকাঠামোগত অবস্থাটা আজও ঠিকঠাক হলো না। এটাই আমার কাছে বড় অপ্রাপ্তি। প্রায়ই মনে হয়, ঠিকমতো কাজ করতে পারলাম না। আমাদের সিস্টেমটা আজও হয়নি। ১০টা মানুষ যখন একটা কাজ করে, তখন স্বাভাবিকভাবে একটা সিস্টেম দাঁড় করাতে হয়। না হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অথচ একটা নাটকের পেছনে কমপক্ষে ২৫-৩০ জন মানুষ পরিশ্রম করে। কিন্তু কোনো সিস্টেম নেই।

অভিনেতা মোশাররফ করিমের কাছ থেকে ১২ বছরে অনেক কিছু পেয়েছে দর্শক। প্রশ্নটা হলো, আপনার যেটুকু দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, সেটা কি পুরোপুরি নিতে পেরেছে পরিচালক, টেলিভিশন, এমনকি দর্শক?

এটার উত্তর দিলে নিজেকে খুব বড় করে দেখা হয়। তাই উত্তরটা না দেওয়াই ভালো। তবে প্রায়ই মনে হয়, আমি আরও অনেক কিছু করতে পারতাম, করা হয়নি। ওই সিস্টেমটা ঠিকঠাক থাকলে একটা চরিত্রকে অসাধারণ স্তরে নিয়ে যাওয়ার সাধনাটা করতে পারতাম।

কিন্তু আপনি ইন্ডাস্ট্রির এক নম্বর অভিনেতা। চাইলে যে সিস্টেমের কথা বলছেন, সেটা পরিবর্তন করতে পারেন।

মানুষ হিসেবে আমারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এটা মনে হয় সবারই থাকে। একটা প্রোডাকশনের লাইট, ক্যামেরা, অভিনয়শিল্পী, সেট ডিজাইনার, চিত্রনাট্য—সব একসুতোয় বাঁধা থাকে। সেই সুতোটা থাকে পরিচালকের হাতে। এটাই নিয়ম হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাঁর হাতে সবকিছু নেই। দেখা যায়, চ্যানেলেরও কিছু বক্তব্য থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে আপস করতে হচ্ছে। পরিচালকই নিজের জায়গায় ঠিক থাকতে পারছেন না।

একটি নাটক ২৬, ৫২ বা ১০৪ পর্ব, যা-ই হোক না কেন, চিত্রনাট্য পড়ে সেটা চূড়ান্ত করবে চ্যানেল। কোনো সমস্যা থাকলে সেটা শুটিংয়ের আগে আলোচনা করে সমাধান করবে। এতে পরিচালকের স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে হয় উল্টো। চ্যানেল হয়তো গল্পটা শুনল। তারপর বানাতে বলল। বানিয়ে নিয়ে গেলে বলা হয়, এটা এভাবে করো, ওটা ওভাবে করো। সেটা আগে হলে কি ভালো হয় না?

এই যে এত সমস্যার কথা বলছেন, এগুলো নিয়ে কি কখনো মানসিক চাপ অনুভব করেন?

হ্যাঁ, করি। আমি বাজার করতে ভালোবাসি না, সংসারধর্ম পালন করি না—শুধু অভিনয় করতেই ভালোবাসি। এটাও যদি ঠিকমতো করতে না পারি, তাহলে সেটা ভীষণ কষ্ট দেয়। আপস করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত। একটা উদাহরণ দিই। চরিত্রের জন্য একটা চেয়ারে বসতে হবে। বসতে গিয়ে মনে হলো, এটা নাটকের গল্প, সময়, চরিত্র—কোনো কিছুর সঙ্গে চেয়ারটা মানানসই নয়। তাহলে হবে কী, আমি ওই চেয়ারটায় বসে সেই চরিত্রের ফিলিংসটা পাব না, যেটা ওই চরিত্রের পাওয়া উচিত। প্রপস তো একটা অনুভূতি দেয়। তাহলে কী করা উচিত আমার? প্যাকআপ করে চলে যাওয়া। এটাই হয়তো স্মার্ট কাজ। কিন্তু আমরা সেটা পারি না। আমাদের দুর্বলতাই এটা। পরিচালক এসে অনুরোধ করেন। করে তো ফেলি কিন্তু মনের মধ্যে কি একটা অতৃপ্তি কাজ করে না? জমে জমে সেই অতৃপ্তি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

এই অতৃপ্তি নিয়ে তো কাজ করা কঠিন!

ঠিক। কাজ করা কঠিন। কিন্তু উপায় তো নেই। আমার একটা ব্যাখ্যা আছে। প্রায়ই ভাবি, আমরা যখন থিয়েটার করতাম, তখন একটি টাকাও ওখান থেকে পেতাম না। সেটা প্রফেশনাল জায়গা না। কিন্তু আমরা কাজটা করতাম খুব প্রফেশনাল (পেশাদারভাবে)। টেলিভিশনে টাকা পাচ্ছি কিন্তু কাজটা প্রফেশনালি করছি না। বলতে হবে করতে পারছি না। করতে না পারার পেছনে অন্তরায় হলো থিয়েটারে একটা দলে ৩০-৪০ জন সদস্য থাকে। সব কটি সদস্যের মধ্যে একটা দলগত দর্শন কাজ করে। দেখা যায় যে তরুণ কখনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করবে না এবং যে করবে সবার একই দর্শন (ফিলোসফি)। দুজন একই রকম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভব করে। কিন্তু টেলিভিশন নাটকের বেলায় সেই দর্শনটা গড়ে ওঠেনি। নাটকের প্রতি যে ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা থাকার, তা নেই। থিয়েটার করার সময় আমরা ভাবতাম ‘আমরা একটা মহৎ কাজ করছি’ এবং সেটা সবার অন্তরের মধ্যে থাকত। কিন্তু টেলিভিশনে সেটা হচ্ছে না। যদি পরিচালক, সহকারী পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, লাইট, ক্যামেরা, মেকআপসহ সবার মধ্যে ফিলিংসটা হয়, তাহলে সেরা কাজটি হওয়া সম্ভব। সেই কাজটা হয় না, কারণ চর্চার অভাব (স্কুলিং)। থিয়েটারে আমরা শিল্পের চর্চার মধ্যে ছিলাম। থিয়েটার করা একটি ছেলে হয়তো কখনোই মঞ্চে উঠবে না, নাটক করবে না, তাই বলে তার মধ্যে শিল্পের চেতনা নেই, তা কিন্তু না। টেলিভিশন নাটকে শিল্পের চেতনার অভাবটা ব্যাপক।

একটা ছেলে ইউটিউব বা ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখে ক্যামেরা চালানো শিখে নিতে পারে। লাইটটাও শিখতে পারে। কিন্তু শিল্পের ব্যাপারটা তাকে ইউটিউব শেখাবে না। এটা বোঝার জন্য শিল্পের মধ্যে বসবাস দরকার। শুধু ক্যামেরা নয়, এটা লাইট, প্রোডাকশন সব ক্ষেত্রেই। বুঝতে হবে, তারা যে কাজটা করছে সেটা অন্য দশটা কাজ থেকে আলাদা। আমি যে কাজটা করছি এটা শিল্পের কাজ, একটা গ্রেট ওয়ার্ক, এই অনুভূতিটা আসতে হবে। এটা যেদিন সবার মধ্যে ছড়াবে, সেদিনই পরিবর্তন ঘটবে।

আপনার চরিত্রগুলো একঘেয়ে হয়—এমন অভিযোগ আছে। চিত্রনাট্য বাছাই না করেই কাজ করেন বলে শোনা যায়।

মুশকিলটা হলো, মোশাররফ করিম করছে এ কারণে এটা সমস্যা। আসল কথা হলো এটা কিন্তু ওই আপসের ফসল। এমন হয়, আমাকে না জানিয়েই টেলিভিশনে আমি অভিনয় করছি এমন নিশ্চয়তা দিয়ে নাটক পাস করিয়ে আনা হয়। আমরা আসলে বিভিন্নভাবে শিকার হয়ে যাই। আমার করতে ইচ্ছে হয় না, চাচ্ছি না, কিন্তু করছি। সে ক্ষেত্রে হয়তো বলবেন, আপনার ঘাড়ে কি পিস্তল ঠেকায়? আমি বলব, পিস্তলের চেয়েও বড় কিছু ঠেকায়। এ কারণে চিত্রনাট্য বাছাই করার সুযোগ পাই না।

আপনি প্রায়ই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেন, এখন থেকে বেছে বেছে কাজ করবেন। সেটা কি বাস্তবায়ন হয়েছে?

এবার আমি অনড়। এবার আমার পছন্দ না হলে কাজ করব না। কিন্তু ঘটনা হলো, দেশে তো নানা ধরনের দর্শক আছেন। সবার কথা মাথায় রেখেই তো অভিনয় করতে হয়। আর নাটকের তো নানা রকম ফর্ম থাকে। স্যাটায়ার ফর্ম, কমেডি, ট্র্যাজেডি। সবকিছুর মূলে হলো ‘হয়ে ওঠা’। একটা মানুষ আধঘণ্টা ধরে ডিগবাজি দিচ্ছে। এটা দিয়ে সে কিছু বলতেও চায়নি, শেখাতেও চায় না। যদি ডিগবাজিটা ঠিকমতো হয়ে থাকে তাহলেই সে সফল। একটা বাচ্চা এই রাস্তার খেলছে। এটা আমরা সবাই দেখছি। এখানে আমরা কী পাচ্ছি? ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যাবে, আমরা ওর প্রাণবন্ততা দেখছি। এটাই তো দেখার ব্যাপার। জীবনানন্দ দাশই তো বলে গেছেন, ‘আমরা মৃত্যুর আগে কী বুঝিতে চাই আর?…রৌদ্র নিভে গেলে পাখিপাখলির ডাক, শুনিনি কি? প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক।’

কাক তো উড়ে যাওয়ার সময় বলেনি, আমাকে দেখো। এটার তো ব্যাখ্যা নেই। কাকটা উড়ে গেছে তারপর কেমন যেন লাগছে। এই কেমন লাগার জন্যই তো কাজ করি।

কোনো বিশেষ চরিত্রের জন্য আফসোস হয়।

না সে রকম না, আমার কাছে যেটা মনে হয়, সব চরিত্রই চরিত্র। তাই আমার কাছে সব চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো পুরস্কার?

না। পুরস্কার পাওয়ার আগে যে টেনশনটা তৈরি হয়, ওই কারণে আমার পুরস্কারের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। মানে পুরস্কার দেওয়ার কায়দাটা আমার ঠিক পছন্দ নয়।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আমরা জেনেছি, বিচিত্র আপনার জীবন। কোনটা আপনার জীবনের সেরা সময় বলে মনে হয়?

আমার কাছে সেরা সময়টা কৈশোর। ওই সময় মাত্র পাঁচ বছর গ্রামে থেকেছি। গ্রামের আলো-বাতাসে বড় হয়েছি। আমার মনে হয়, প্রত্যেক বাচ্চারই ওই সময়টাতে গ্রামে থাকা উচিত। কারণ, তাহলে সে খাঁটি অন্ধকার দেখবে, খাঁটি জোছনা দেখবে, খাঁটি মানুষ দেখবে।

কখনো মনে হয়, আমি মোশাররফ করিম না হয়ে অন্য কেউ হলে ভালো হতো। মানে অন্য কোনো জীবনযাপন।

না, এ রকম কখনোই মনে হয় না। তবে নুসরাত ফতেহ আলীর গান শুনে মনে হয়, আহা, তার মতো যদি গাইতে পারতাম।

জীবন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন এবং দর্শন কী?

এই জীবনের নিয়ন্ত্রক আমি না। কখনোই ছিলাম না। তবে আমি একজন প্রেমিক। প্রেমিকের বোধ হয় প্রাপ্তিযোগ ঘটে। অন্য কারও কথা বলতে পারব না, আমার নিজস্ব একটা কিছু ব্যাপার আছে। একটা মানুষ দিন দিন পাকা (সিজনড) হয়ে ওঠে। তখনই সিজনড হয়ে ওঠে, যখন সে একটা সঠিক পথে যেতে চায়। মাঝের পথটুকুতে সে রৌদ্রে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে। এত কিছুর পর যদি সে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়, তাহলে সে সিজনড হয়ে ওঠে। আর পথভ্রষ্ট হলে তো শেষ। চলার পথে আমার একটা দর্শন আছে। ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও, বিরক্ত কোরো না।’ মাথায় রাখতে হবে, এই যে তুমি পা ফেলছ, এতে কি কারও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে কি না।

ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনি আর আগের মতো জনপ্রিয় নন। খারাপ লাগবে?

এটা একটা ‘শক’ হবে আমার কাছে। একটা বড় ধরনের ঝাঁকি হবে আমার জন্য। কীভাবে সবার সঙ্গে মিশব বা আমি কীভাবে থাকব, এই ব্যাপারটা আজ আর বলব না। এটা তোলা থাক।

সেলিম

লেখক